দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে তাঁতসমৃদ্ধ জেলা সিরাজগঞ্জের তৈরি লুঙ্গি, গামছা ও শাড়ি। আড়াই লক্ষাধিক তাঁতকে ঘিরে অন্তত ১০ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া এ জেলায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার তাঁতপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। জেলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই চালিকাশক্তিকে সম্মান জানিয়ে সিরাজগঞ্জকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে ‘তাঁতকুঞ্জ সিরাজগঞ্জ’ নামে।
একসময় ভোরের আলো ফুটতেই সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লিগুলো হস্তচালিত তাঁতের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠত। তবে কালের বিবর্তনে এখন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পে লেগেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন বাড়াতে কারখানাগুলোতে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ার লুম। বর্তমানে জেলায় হস্তচালিত হ্যান্ডলুম ও আধুনিক পাওয়ার লুম মিলিয়ে সক্রিয় তাঁতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আড়াই লক্ষাধিক, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের লুঙ্গি ও গামছা তৈরি হচ্ছে।
তাঁতপল্লির কর্মচাঞ্চল্য নিয়ে শ্রমিক আব্দুস ছালাম ও সবুর আলী জানান, সারা বছর কাজ থাকলেও বিশেষ করে বাংলা নববর্ষ এবং দুই ঈদকে কেন্দ্র করে এখানকার পণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ওই সময়ে কাজের চাপ ও ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকায় প্রতিদিনের আয়ে সংসারে সচ্ছলতা আসে এবং অভাব-অনটন দূর হয়।
পণ্য বিপণন ও চাহিদার বিষয়ে তাঁত মালিক আসাদ মুন্সি বলেন, সিরাজগঞ্জের তাঁতের লুঙ্গি, শাড়ি ও গামছার কদর দেশজুড়ে রয়েছে। সারা দেশ থেকে ব্যাপারীরা স্থানীয় হাটগুলোতে এসে এসব পণ্য পাইকারি দরে কিনে নিয়ে যান। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাজারেও এখন নিয়মিতভাবে যাচ্ছে এখানকার তাঁতপণ্য।
বেলকুচি তাঁত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বৈদ্যনাথ জানান, জেলায় আড়াই লক্ষাধিক তাঁতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কর্মরত রয়েছেন। কারিগরদের দক্ষ হাতে তৈরি উন্নত মানের তাঁতসামগ্রী দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে সুনাম কুড়াচ্ছে, যা সমগ্র অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গর্বের। এর সঙ্গে সিরাজগঞ্জের তৈরি লুঙ্গি ও গামছা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের কাজের প্রেরণা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
জিআই স্বীকৃতি প্রসঙ্গে বেলকুচি তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি হাজি আব্দুল বাকী বলেন, এই অর্জন তাঁতসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টারই ফসল। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশীয় তাঁতপণ্যের বাজার আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও জানান, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন বড় কোম্পানি সিরাজগঞ্জের স্থানীয় হাট ও কারখানাগুলো থেকে সরাসরি উন্নত মানের লুঙ্গি ও গামছা সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করছে। এর ফলে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপণ্য।
