পোশাকশ্রমিক কবির মিয়া এক মাস আগে বিকেলে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে সড়কে বেশ কিছু টাকা পড়ে থাকতে দেখেন। টাকাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সেদিন রাত ৯টা পর্যন্ত এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মালিকের খোঁজ করেন।
এরপর প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া–আসার পথে অটোরিকশাচালক, কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের কাছে জানতে চান, কেউ টাকা হারিয়েছেন কি না।
তবে এত চেষ্টার পরও কবির মিয়া সন্ধান পাননি প্রকৃত মালিকের।
জানা যায়, কবির মিয়া পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের হাসনহাটা গ্রামের মো. আকবর আলীর ছেলে। তিনি স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। কুড়িয়ে পাওয়া টাকার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ না বললেও তিনি জানিয়েছেন, টাকার পরিমাণ পাঁচ অঙ্কের ঘরে।
এদিকে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) পর্যন্ত মালিকানা দাবি করে কেউ টাকাগুলো নিতে আসেননি। ফলে শেষ চেষ্টা হিসেবে এক হাজার টাকা খরচ করে ঘটনাস্থল ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় মাইকিং করিয়েছেন তিনি।
দিনভর নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন ও ঘোড়াশাল পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে এ মাইকিং করা হয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল থেকে ডাঙ্গার চরকা পোশাক কারখানা, ডাঙ্গা বাজার, ঘোড়াশালের ঘোড়া চত্বর ও ভিরিন্দা এলাকায় মাইকিং করেন কবির মিয়া। পরে কারখানার বিভিন্ন ফটকের সামনেও মাইকিং করা হয়।
আগে থেকে ধারণ করা মাইকিংয়ে বলা হয়, ‘গত মাসে অক্টোবরের তিন তারিখ রোজ শনিবার ঘোড়াশাল থেকে দৃষ্টিনন্দন ও ফকিরার রাস্তা ধরে আসার পথে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যায়। সঠিক তথ্য দিয়ে টাকাগুলো নেওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হলো। যোগাযোগের ঠিকানা: পূর্ব হাসনহাটার মরহুম সাহাজউদ্দিনের বাড়ির জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে।’
এ সময় নিজের মোবাইল নম্বরও প্রচার করেন কবির মিয়া।
ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে কবির মিয়া বলেন, গত ৩ অক্টোবর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ঘোড়াশাল–ডাঙ্গা সড়কের হাসনহাটা এলাকায় টাকাগুলো পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। কুড়িয়ে নেওয়ার পর এলাকাবাসীকে বিষয়টি জানান। রাত ৯টা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেও মালিককে না পেয়ে স্থানীয় মসজিদের ইমামের পরামর্শে কয়েক দিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই দিন প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চরকা কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে গিয়েও মাইকে টাকা পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। পাশাপাশি প্রতিদিন কাজে যাওয়া–আসার পথেও খোঁজ নিতে থাকেন। কিন্তু এক মাসেও কেউ টাকার খোঁজে না আসায় গতকাল মাইকিং করানোর সিদ্ধান্ত নেন কবির।
টাকাগুলো দান বা খরচ না করে মালিকের খোঁজে মাইকিং করার প্রসঙ্গে কবির বলেন, ‘জানি না কার টাকা। হয়তো অনেক কষ্টের টাকা। অন্যের টাকা তো আমি খরচ করতে পারি না, আবার দানও করতে পারি না। ইমাম সাহেব কেউ আসে কি না, অপেক্ষা করে দেখতে বলায় এত দিন অপেক্ষা করেছি।’
কবির মিয়া উল্লেখ করেন, মাইকিংয়ের জন্য কুড়িয়ে পাওয়া টাকা থেকে এক হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে কেউ না এলে টাকাগুলো এতিমখানায় দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পূর্ব হাসনহাটা বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমাম নাজমুল হাসান বলেন, টাকাগুলো কোনো শ্রমিকের বেতনও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মালিকের সন্ধানে মাইকিং করা ছাড়া বিকল্প না পেয়ে কবির এ উদ্যোগ নেন।
তিনি উল্লেখ করেন, কবির সততার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নির্লোভ থেকে অন্যের সম্পদ ফেরত দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন কবির।
