সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ

রিকশা ছাড়াতে পাঁচ লাখ টাকা দাবি পুলিশের, গোপনে রেকর্ড করায় চুরির মামলায় বাবা-ছেলে গ্রেপ্তার

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২০:৪৩

মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানায় আটক রিকশা ছাড়াতে গিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলেছেন এক তরুণী। তার দাবি, টাকা চাওয়ার কথোপকথন গোপনে মুঠোফোনে ধারণ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাবা ও ভাইকে চোরাই মালামাল কেনাবেচার মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের জব্দ করা সাইকেল, মুঠোফোন ও সিসিটিভির হার্ডডিস্ক ফেরত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ।

রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সফিউদ্দিন আহমেদ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন সায়মা আক্তার। তিনি গ্রেপ্তার মো. শাহজাহান শেখের মেয়ে।

এর আগে গত ২৩ অক্টোবর টঙ্গিবাড়ী থানার সামনে পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়, চোরাই বাইসাইকেল ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. শাহজাহান শেখ ওরফে শাহজাহান মুন্সী (৬৫) এবং তার বড় ছেলে শামীম শেখকে (২৮) গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনই টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আড়িয়ল ইউনিয়নের বিলের পাড় সানবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। সেদিন শাহজাহান মুন্সীর গুদাম থেকে ৪২টি বাইসাইকেল ও দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয় বলে জানায় পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সায়মা আক্তার বলেন, গত ১৯ অক্টোবর বালিগাঁও বাজারের ভ্যানচালক শাহীনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দুটি রিকশা কেনেন তারা বাবা। তার মধ্যে ওই দিনই ২৫ হাজার এবং ২২ অক্টোবর আরও ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

সায়মার অভিযোগ, ২২ অক্টোবর দুপুরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের গ্যারেজে গিয়ে তালা খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। একপর্যায়ে গ্যারেজ খুললে পুলিশ দুটি রিকশা নিয়ে যায়। এ সময় তাঁর ভাইকে মারধর করা হয়। গ্যারেজে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ঘটনার দৃশ্য ধারণ হয়েছিল। পরে পুলিশ সদস্যরা ক্যামেরা ভেঙে হার্ডডিস্ক নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সায়মা বলেন, ওই দিন সন্ধ্যায় রিকশা দুটি ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা বলে তার বাবা ও ভাইকে ফোন করে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। তারা থানায় গেলে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ওসমান আলীসহ আরও দুজন পুলিশ সদস্য তাঁর বাবার কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে রিকশা আটকে রাখা এবং বাবা-ছেলেকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সায়মা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তার বাবা ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। এ সময় তার ভাই গোপনে নিজের মুঠোফোনে পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ ধারণ করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে পুলিশ সদস্যরা ক্ষুব্ধ হন। পরে টাকা না নিয়ে তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে দুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও বিকাশ লেনদেনে ব্যবহৃত একটি বাটন ফোনসহ মোট তিনটি মুঠোফোন কেড়ে নেন। পরে বাবা ও ভাইকে থানায় আটকে রাখা হয়। একই সঙ্গে তাদের গ্যারেজ থেকে ৪২টি সাইকেল নিয়ে যায় পুলিশ।

সাইকেলগুলো চোরাই নয় দাবি করে সায়মা বলেন, তার বাবা বিভিন্ন সময় মানুষের কাছ থেকে সাইকেল কিনে মেরামতের জন্য গ্যারেজে রাখতেন। কিছু সাইকেল তিনি নিজেও কিনেছিলেন। মেরামতের পর সেগুলো ভাড়ায় চালানোর জন্য দেওয়া হতো। এটি তাদের বাবার বৈধ ব্যবসার অংশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গিবাড়ী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুর রহিম মোল্লার বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন সায়মা। তিনি বলেন, তার ভাইয়ের মুঠোফোন ফেরত চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা নানা টালবাহানা করছেন। পাশাপাশি তার ভাইকে রিমান্ডে নেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। রিমান্ড থেকে রক্ষা করতে বালিগাঁও ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কামাল হোসেন খানের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে সায়মা বলেন, তার বাবা ও ভাইয়ের কাছ থেকে নেওয়া তিনটি মুঠোফোন এবং সিসিটিভির হার্ডডিস্ক উদ্ধার করতে হবে। হার্ডডিস্কের কোনো ভিডিও যেন মুছে ফেলা না হয়। ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করলেই তাদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা টাকা দাবির অভিযোগ তদন্ত, মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং তাদের ব্যবসার সাইকেলগুলো ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে বালিগাঁও ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কামাল হোসেন খান টাকা চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

টাকা চাওয়া ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়ার বিষয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান আলী বলেন, ‘টাকা কে চেয়েছে, এমন বিষয় আমি জানি না। তবে ভালো কাজ করলে বদনাম হয়। আমাকে জড়ানো হচ্ছে।’

মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন বলেন, ‘মামলার বিষয়টি তদন্তাধীন। যেহেতু গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ এসেছে, সেটিও আমরা আমলে নিচ্ছি। তদন্তে যদি পুলিশের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইত্তেফাক/এমএসআর