প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি

তদন্ত কমিটির ফোকাসে তিন প্রশ্ন

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৪

জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে দেশে ফেরার পথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটে (ইএ৩৭৭) দেখা দেওয়া কারিগরি ত্রুটির কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি এখন তিন প্রশ্ন ফোকাসে রেখে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ বিমানের বহরে এখনো একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও কেন ত্রুটির ইতিহাস থাকা নির্দিষ্ট উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল, অতীতে শনাক্ত হওয়া ত্রুটিগুলো যথাযথভাবে মেরামত করা হয়েছিল কি না এবং জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে কারিগরি ত্রুটি সারাতে কেন দীর্ঘ পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছিল—মূলত এসব বিষয়কে সামনে রেখেই তদন্ত এগোচ্ছে।

এছাড়া অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, বিমানের গঠিত তদন্ত দল ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের কারিগরি ত্রুটির ঘটনায় সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে।

তদন্তের প্রয়োজনে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দল, নারিতা স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার এবং বিমানের মেইনটেন্যান্স কন্ট্রোল সেন্টারের (এমসিসি) কর্মকর্তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উড়োজাহাজটির কারিগরি নথিপত্রও গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে কমিটি।

তদন্ত দল মূলত যে তিনটি প্রশ্নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে-

উড়োজাহাজ নির্বাচনের যৌক্তিকতা: তদন্তের প্রথম প্রশ্ন হলো, বিমানের বহরে একাধিক সচল ও নিরাপদ উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও কেন এস২-এজেওয়াই রেজিস্ট্রেশনের উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি সফরের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে উড়োজাহাজটির সাম্প্রতিক কারিগরি সক্ষমতা, অতীতের ত্রুটির ইতিহাস এবং কোনো বিকল্প বা ব্যাকআপ উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। উড়োজাহাজ নির্বাচনের সিদ্ধান্তের পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও দাপ্তরিক নথিও স্ক্রিনিংয়ের আওতায় রয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি ছাড়পত্র: দ্বিতীয় প্রশ্নটি উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ও কারিগরি ছাড়পত্রের বৈধতা নিয়ে। নারিতা বিমানবন্দরে একের পর এক ত্রুটির সংকেত পাওয়ার আগে উড়োজাহাজটির কারিগরি অবস্থার যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য বিগত তিন থেকে ছয় মাসের টেকনিক্যাল লগবুক, ত্রুটি শনাক্তের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড পরীক্ষা করছে কমিটি। প্রতিটি ত্রুটির বিপরীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং কার চূড়ান্ত অনুমোদনে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নযোগ্য (Airworthy) ঘোষণা করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নারিতায় মেরামতে অস্বাভাবিক বিলম্ব: তৃতীয় প্রশ্নটি নারিতা বিমানবন্দরে কারিগরি ত্রুটি সমাধানে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লাগা নিয়ে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে সমাধানযোগ্য ত্রুটিটি দূর করতে কেন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নারিতা বিমানবন্দরে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট ও নিজস্ব স্থায়ী প্রকৌশলী না থাকায় স্থানীয় গ্রাউন্ড সার্ভিস এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। ফলে ঢাকা এমসিসির সঙ্গে যোগাযোগ, কারিগরি নির্দেশনা ও লজিস্টিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমন্বয়হীনতা ছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

যেভাবে ধরা পড়ে ত্রুটি: জানা গেছে, নারিতায় প্রাক্-ফ্লাইট পরিদর্শন শেষে প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম উড়োজাহাজটির এয়ারওয়ার্দিনেস ও রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন এবং যাত্রী পরিবহনের ছাড়পত্র দেন ককপিট প্রধান ক্যাপ্টেন ইমামুল। কিন্তু উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে রানওয়ের দিকে যাওয়ার সময় ককপিটে স্পয়লার, ফ্লাপ কমান্ড, বাম পাশের পিটোট হিট ও র‌্যাম ফ্যানের একাধিক ত্রুটির সংকেত দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেন ইমামুল তাত্ক্ষণিকভাবে উড্ডয়ন বাতিল করে উড়োজাহাজটিকে পার্কিং বে-তে ফিরিয়ে নেন।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের পরিচালককে ইতিমধ্যে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া, চার কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন না হওয়ায় কমিটির আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা আরও তিন কার্যদিবস বাড়ানো হয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ বা সাময়িক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিলেই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নিরাপত্তাঝুঁকি দূর হবে না। বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে কার কী ভূমিকা ও গাফিলতি ছিল, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তদন্ত কমিটির কার্যক্রম নিয়ে এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা যাবে না উল্লেখ করে বাংলাদেশ বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ ইত্তেফাককে বললেন, তবে যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

উল্লেখ্য, তদন্ত কমিটিতে প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং প্রধানকে সভাপতি এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোডাকশন) সদস্য করা হয়েছে। এছাড়া ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি) সদস্য এবং ব্যবস্থাপক (আইন বিষয়ক) সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিরপেক্ষ ও নিখুঁত তদন্তের স্বার্থে এই কমিটিকে বিমানের যে কোনো কর্মকর্তাকে সদস্য হিসেবে যুক্ত (কো-অপ্ট) করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমএস