ভাঙ্গুড়ায় ‘গরু ছাড়াই দুধ’ তৈরির চক্র বেপরোয়া!

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৯

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ‘গরু ছাড়াই দুধ’ তৈরির চক্র বেপরোয়া। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও নকল দুধ উত্পাদন বন্ধ করা যাচ্ছে না। কিছু কেমিক্যাল দিয়ে দুধ বানিয়ে লাখ লাখ টাকা কামানো যায় বিধায় এরা জরিমানাকে পাত্তা দেয় না। ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলে সেই জরিমানা পরিশোধ করে ফের নেমে পড়ে একই অপকর্মে। বিব্রত হওয়া কিংবা ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তারা খুঁজে বের করে তাদের দুধ তৈরির কেমিক্যালের ভান্ডার সম্পর্কে প্রশাসনকে তথ্য দিল কারা। এরপর তাদের মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দেয়। গতকাল রবিবার বিকালে উপজেলার ছোট বিশাকোল গ্রামের লিখন আদনান নামের এক যুবক এই অভিযোগে ভাঙ্গুড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। থানার ডিউটি অফিসার এ এস আই সিরাজুল ইসলাম অভিযোগটি গ্রহণের কথা স্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, ভাঙ্গুড়ার অন্তত ৩০টি দুধের কারখানা বা চিলিং সেন্টার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তাদের কারখানায় গরু ছাড়াই দুধ তৈরি করছে। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন এরকম কয়েকটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে জানতে পারে যে, এক ধরনের জেলি, সয়াবিন তেল, চিনি ও পানি মিশিয়ে ব্লেন্ডারে দিয়ে বানিয়ে ফেলে গরুর নকল দুধ। এই দুধ তারা ‘আসল’ নাম দিয়ে বিক্রিও করতে পারছে। ফলে ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য গরুর খামারের পেছনে না ছুটে এটাকেই ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে।

সম্প্রতি উপজেলার কৈডাঙ্গা গ্রামের আবুল বাশারের কারখানায় অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ জেলি ও সয়াবিন তেল জব্দ করার পর গরু ছাড়াই দুধ তৈরি রহস্য ফাঁস হয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার ছোট বিশাকোল গ্রামের একটি কারখানার পাশের পুকুর থেকে ৬ ড্রাম ভর্তি ৪৫০ কেজি জেলি উদ্ধার করে ধ্বংস করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ঐ ব্যক্তিকে না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি বলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা লিখন আদনান জানান, জেলি, সয়াবিন তেল, পানি ও চিনি মিশ্রিত করে একটি চক্র বিভিন্ন কারখানায় নকল দুধ তৈরি করে গাভীর দুধ বলে বাজারে বিক্রি করে। পুকুরে জেলির ড্রামগুলো দেখতে পেয়ে তিনি ভিডিও ধারণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা  ছেড়ে দেন। পরে উপজেলা প্রশাসন সেখানে অভিযান পরিচালনা করায় তাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। লিখন আরও জানান, এক ব্যক্তিকে একাধিক বার জরিমানা করার পরেও তারা পুনরায় একই কাজ করে।

 ছোট বিশাকোল গ্রাম প্রধান কামরুজ্জামান বলেন, নকল দুধ উত্পাদন প্রতিরোধে গ্রামবাসীকে নিয়ে শনিবার রাতে মিটিং করা হয়েছে। এখন থেকে এ ধরনের কারখানাগুলোর দিকে নজর রাখা হবে যাতে তারা নকল দুধ প্রস্তুত করতে না পারেন। 

উপজেলা লাইভস্টক অফিসার ডা. নাহিদ সুলতান বলেন, ভাঙ্গুড়া উপজেলার বিভিন্ন খামারে উৎপন্ন দুধের মান খুব ভালো। এজন্য এখানকার মিষ্টি, ঘি, মাখন ও দই সুস্বাদু। তবে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী লোভে পড়ে নকল দুধ উৎপাদনে ঝুঁকে পড়েছেন। তিনি বলেন, এই উপজেলায় বেসরকারি উদ্যোগে ৩০টি দুধ কারখানা বা চিলিং সেন্টার রয়েছে। তারা ‘কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর’ থেকে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন।

কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর পাবনার উপমহাপরিদর্শক শেখ আসাদুজ্জামান জানান, এই অধিদপ্তর কেবল কারখানার নাম, কর্মচারী ও পদ-পদবীর বিপরীতে লাইসেন্স দিয়ে থাকে। প্রডাক্টের মান তদারকি করা তাদের দায়িত্ব নয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুরাইয়া মমতাজ বলেন, শিশুখাদ্য হিসেবে নকল দুধ উত্পাদন করা মারাত্মক অপরাধ। এজন্য প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন কারখানা থেকে দুধের স্যাম্পল সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। যার বাড়ি বা কারখানায় নকল দুধ উৎপাদনের প্রমাণ মিলবে তার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ব্যবসায় সততার মনোভাব সৃষ্টি ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে মসজিদেও প্রচারণা শুরু করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমএস