তদন্ত ও বিচারের বিলম্বে হারিয়ে যাচ্ছে ফৌজদারি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ইতিমধ্যে বাদী মারা গেছেন। যারা জীবিত আছেন তাদের সর্বশেষ ঠিকানায় সাক্ষী হাজিরার সমনের চিঠি দিয়েও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার তেজগাঁওয়ে বিএডিসির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ডাকাতির মামলায় মিলেছে এমন তথ্য। সাক্ষী হারিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে হাইকোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ও জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, মামলার তদন্ত ও বিচার যত বিলম্বিত হবে, সাক্ষীর উপস্থিতি তত ক্ষীণ হবে। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত সম্পন্ন করে মামলা বিচারে নিয়ে আসা দরকার। এটা করা সম্ভব না হলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হবে। তিনি বলেন, একটি মামলা প্রমাণের জন্য পাঁচ-সাত জন সাক্ষীই যথেষ্ট। অযথা বেশি সাক্ষী অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করে মামলার বিচার অহেতুক বিলম্বের কোনো মানে হয় না। এজন্য পাবলিক প্রসিকিউটরকেও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৯১ সালের ১৬ মে গভীর রাতে আগারগাঁওয়ের বিএডিসির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঐ দিনই প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোহসীন ভূইয়া বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু ২৯ বছর আগের ডাকাতির ঘটনায় করা মামলার তদন্তেই অতিবাহিত হয়েছে দেড় যুগ। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত ছিল ১৩ বছর। চার জন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে, কিন্তু স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ঐ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০০৫ সালে হাইকোর্ট মামলার ওপর থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। পরে তদন্ত সম্পন্ন করে ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর ১১ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৯৫/৩৯৭/৪২২ ধারায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ছয় জন বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার পর ২০১১ সালের ৮ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। অভিযোগ গঠনের পর কেটেছে আট বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৭৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ছয় জন সাক্ষী হাজির করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ, যাদের সবাই অফিশিয়াল সাক্ষী। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারসহ তিন জন। তারা সবাই ঢাকার আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন। বাকি দুজনের মধ্যে একজন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরে মামলাটি যুক্তি-তর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মঞ্জুরুল ইমাম। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আবেদন দেয়। ঐ আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। এরপরই আদালতে সাক্ষ্য দেন সাবেক সচিব এ টি কে এম ইসমাইল হোসেন।
আরও পড়ুন: ডাক্তারি পাশ না করেও ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক’, অতঃপর জেলে
সংশ্লিষ্ট আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট এস এম জাহিদ হোসেন বলেন, সাক্ষীদের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সঠিক ঠিকানায় সমন যাচ্ছে না। ফলে সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের উপস্থাপন করা গেছে, তাদের সাক্ষ্য ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে মামলাটি প্রমাণের চেষ্টা করা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যা রয়েছে
সিআইডির তত্কালীন তেজগাঁও ইউনিটের পরিদর্শক মো. মাগফুরুল ওয়াদুদের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন যাবত্ বিএডিসির স্টোর থেকে মালামাল (সেচ পাম্পের যন্ত্রাংশ) সরানোসহ আত্মসাতের কাজ চলছিল। এতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঐ কমিটিতে ছিলেন মামলার বাদী। উনি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানান যে, মালামাল মজুতের গরমিল করার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরই ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারকৃত বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ নিজ স্টোরে রক্ষিত যন্ত্রাংশ পাচার করে অন্যত্র বিক্রি করে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।
ইত্তেফাক/অনি

