স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর ‌‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব পেলেন মির্জাপুরের ববিজান

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৩২

দৈনিক ইত্তেফাকে পর পর দুইটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর অবশেষে 'বীরাঙ্গনা' খেতাব পেলেন ববিজান বেগম (৫৮)। এ জন্য তিনি ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৯ জুলাই ববিজানসহ ৪৬ জনের বীরাঙ্গনার নামের তালিকার গেজেট প্রকাশ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। 

জানা যায়, প্রজ্ঞাপনে নামের তালিকায় ববিজান বেগমের ক্রমিক নম্বর ২৭৭। রবিবার মির্জাপুর উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, 'এখন থেকে বীরাঙ্গনা ববিজান বেগম মুক্তিযোদ্ধাদের মতই মাসিক ভাতা ও সম্মানীসহ সরকারের প্রদত্ত সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা পাবেন। এ বিষয়ে সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।'

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ১৩নং বাঁশতৈল ইউনিয়নের বাঁশতৈল পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত আরাদন আলীর মেয়ে বৃদ্ধা ববিজান বেগম। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বীরাঙ্গনা হিসেবে ববিজানের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তিনি মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

রবিবার অসহায় ববিজান বেগমের মুখোমুখি হলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ১৯। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামে ক্যাম্প স্থাপন করে। একদিন পাক হানাদার বাহিনী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিএসসিসহ আরও কয়েকজনের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে গ্রামের নারীদের ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের পালাক্রমে গণধর্ষক করে পাকবাহিনী এবং এদেশীয় কিছু রাজাকার আলবদর বাহিনী। ওই নারীদের মধ্যে আমিও ছিলাম একজন। সে দিনের নির্মমতার কথা মনে হলে এখনও শরীর শিহরে উঠে। এই দেশ কি দিয়েছে আমাকে? সরকারি জমিতে থাকি, সেটুকুও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটি গেলে কোথায় দাড়ামু আমি? কি খামু, কি নিয়ে বাঁচবো এ কথা বলে তিনি কেঁদে ফেলেন। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে স্বাধীনতা যুদ্ধের নানা স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন ববিজান বেগম।  উল্টো তাকে শুনতে হয়েছে খারাপ কথা ও কটূক্তি। মিলেছে মানুষের লাঞ্ছনা, ঘৃণা, নানা অপবাদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বীরাঙ্গনা, মানে সাহসী নারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত নারীদের এই খেতাব দিয়েছেন বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সামাজিকভাবে হয়রানি হওয়ার ভয়ে অনেকেই তা জানাতে নারাজ। আবার অনেকেই তার উপর এমন ঘটনাকে গোপন করে রেখেছেন। তেমনি একজন বীরাঙ্গনা নারী মির্জাপুরের ববিজান বেগম। মাত্র ১৩ বছর বয়সে একই গ্রামের দবু খাঁর ছেলে দুদু খাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তিনি বাংলার সহজ-সরল গৃহবধূ। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। পাক বাহিনীর গণধর্ষণের মতো পাশবিক অত্যাচারে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তারা চলে গেলে আশপাশের বাড়ির লোকজন তাকেসহ আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেন। এতে তিনি সুস্থ হলেও ধর্ষিতা হওয়ার অপরাধে তাকে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয়। 

আরও পড়ুন:  ভারতে নতুন পাঁচ রাজ্যপাল নিয়োগ, আছেন মুসলিমও

পরে সাত বছরের সংসার জীবনের এক বছরের শিশুকন্যা রহিমা আক্তারকে নিয়ে তাকে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি চলে যেতে হয়। সেখানে সৎ মায়ের অভাবের সংসারে বেশি দিন ঠাঁই হয়নি ববিজান বেগমের। দেশ স্বাধীনের কিছুদিন পর ময়মনসিংহের আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এরপর এক ছেলে রফিকুল ইসলামের জন্ম হয়। কিন্তু মালেকের আগের স্ত্রী-সন্তান থাকায় সেখানেও টিকতে পারেননি তিনি। ছেলে রফিকুলকে নিয়ে ফিরে আসেন বাবার বাড়ি বাঁশতৈল গ্রামে। বাবা আরাদন আলী মারা যাবার পর সৎ মায়ের সংসারে ঠাই হয়নি তার। তিনি সরকারি একটু জমিতে ঘর তুলে ছেলে রফিকুল ও মেয়ে রহিমাকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। শিশু ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভিক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে চলতে থাকে তার সংসার। তার এমন দুরবস্থা দেখে বাঁশতৈল গ্রামের বৃদ্ধ ইয়াদ আলী নিজেকে সেবাযত্ন করার জন্য ববিজানকে স্ত্রীর মর্যাদা দেন।

ইয়াদ আলী মারা যাবার পর অসহায়ত্বের কারণে সরকারি বনাঞ্চলের রিজার্ভের একটি প্লট পান ববিজান বেগম। সেখানে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু তার সেই প্লট নিয়েও একই গ্রামের গফুর মিয়ার ছেলে নুরু মিয়াসহ আরও কয়েকজন মিলে নানাভাবে হয়রানি করে আসছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে তার ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেওয়া হবে। অথচ নূরু মিয়ার নামে ৩ থেকে ৪টি সরকারি প্লট রয়েছে। বয়স হওয়ায় ববিজান এখন কানে কম শোনেন, স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। কাজ করতে না পারায় ছেলের সংসারে খেয়ে না খেয়ে কাটছে। তবু বয়স্ক, বিধবা ভাতা পাননি ববিজান, পাননি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও।

মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিচারণ তোলে ধরে বৃদ্ধা ববিজান বলেন, 'পাকবাহিনীর ওই অত্যাচারের পর বাংলার মানুষের লাঞ্ছনা, ঘৃণা, অপবাদ আর স্বামীর সংসার হারিয়েছি। তাই লোক লজ্জার ভয়ে এতদিন বীরাঙ্গনার কথা কাউকে বলতে পারিনি। আর যারা আমার বীরাঙ্গনার বিষয়টি জানে, তারাও আমার কোন খবর রাখেনি। এছাড়া বয়স্ক, বিধবা ভাতা পাইনি, পাইনি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও। জীবনযুদ্ধের পেয়েছি শুধু দুঃখ-দুর্দশা, হয়রানি। দেশের জন্য আজ আমি বীরাঙ্গনা, দেশ আমাকে কি দিল?' এ কথা বলে কেঁদে ফেলেন।

এদিকে ববিজানকে নিয়ে ২০১৬ সালে ডিসেম্বর মাসে দৈনিক ইত্তেফাকের মির্জাপুর সংবাদদাতা মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল মহিলা অঙ্গন বিভাগে ও নিয়মিত সারা দেশ পাতায় বিস্তারিত তুলে ধরে পর পর দুইটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদন দুইটি প্রকাশে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনের সূত্র ধরে টাঙ্গাইলের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাকসুদুর রহমান পাটোয়ারী, মির্জাপুর উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুম আহমেদ ববিজান বেগমকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঢেকে নিয়ে কিছু নগদ টাকা ও থাকার জন্য ঢেউটিন তুলে দেন। এছাড়া তাকে বীরাঙ্গনার খেতাবসহ সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ছিলেন। দীর্ঘ তিন বছর পর অবশেষে বীরাঙ্গনার খেতাবের গেজেট প্রকাশ হওয়ায় ভাগ্যের পরিবর্তন হতে চলেছে ববিজানের।

এ ব্যাপারে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবদুল মালেক এবং উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বলেন, 'ববিজান বেগম বীরাঙ্গনার খেতাব পেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে, এমন গেজেট প্রকাশের পর মুক্তিযোদ্ধাদের মতই প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য সকল সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।'

ইত্তেফাক/জেডএইচডি