এইচএম এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) সংসদের ভেতর-বাইরে নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার পরিবারে বিরোধ প্রকট হয়ে উঠেছে। এতদিন দলের ‘চেয়ারম্যান’ পদ নিয়ে এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ ও তাঁর ছোট ভাই জিএম কাদেরের মধ্যে মতপার্থক্য চলে আসলেও এবার এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদ নিয়ে প্রকাশ্য বিবাদ। জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের তাকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নিয়োগ দানের জন্য গতকাল মঙ্গলবার সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে চিঠি দিয়েছেন। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পার্লামেন্টারি পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত হয়েছেন বলে চিঠিতে দাবি করেন জিএম কাদের। এই খবরে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ গতকাল বিকালে তাঁর গুলশানের বাসায় দলের কয়েকজন এমপিকে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দেওয়া হবে। অন্যদিকে, রংপুর-৩ আসনে আগামী ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও এরশাদের পরিবারের গত কয়েকদিনের দ্বন্দ্ব এবার সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
স্পিকারকে দেওয়া জিএম কাদেরের স্বাক্ষরিত চিঠিটি গতকাল বিকালে সংসদ ভবনে স্পিকারের দপ্তরে পৌঁছে দিয়েছেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদের নেতৃত্বে দলটির পাঁচজন সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। চিঠির সঙ্গে দলের প্রেসিডিয়াম সভার রেজুলেশন এবং জাপার ২২ জন এমপির মধ্যে ১৫ জনের সম্পত্তিপত্রও সংযুক্ত করা হয়। স্পিকার তখন দেশের বাইরে থাকায় চিঠিটি রিসিভ করেন তার দপ্তরের কর্মকর্তারা। এছাড়া সংসদ সচিবের কাছেও চিঠির একটি কপি দেওয়া হয়েছে। ফিরোজ রশীদের সঙ্গে এসময় জাপার এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, আদেলুর রহমান, নাজমা আক্তার ও শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ উপস্থিত ছিলেন।
স্পিকারের দপ্তরে জিএম কাদেরের চিঠি পৌঁছে দেওয়ার পর কাজী ফিরোজ রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্রে লেখা আছে পার্টির চেয়ারম্যানই পার্লামেন্টারি পার্টির প্রধান। সেই হিসেবে জিএম কাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির মতামতের ভিত্তিতে বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত হয়েছেন। স্পিকার আজ (মঙ্গলবার) রাতেই দেশে ফিরবেন, সকালে দপ্তরে এলে হয়তো তিঁনি চিঠিটা পাবেন।’
জিএম কাদেরের চিঠির একটি কপি ইত্তেফাকের কাছেও রয়েছে। চিঠিতে জিএম লিখেছেন, ‘ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং পার্টির সংসদীয় দলের সংগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যগণ বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমি গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার জন্য প্রস্তাব করেছেন। অতএব সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমাকে নিয়োগ দানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।’
স্পিকারকে জিএম কাদেরের চিঠি দেওয়ার খবর পেয়ে জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ তাঁর গুলশানের বাসায় দলীয় এমপিদের ডেকে পাঠান। তবে তার ডাকে সাড়া দিয়ে দলীয় এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফখরুল ইমাম ও লিয়াকত হোসেন খোকাসহ কয়েকজন সেখানে যান। রাত সাড়ে আটটায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠকটি চলছিল। বৈঠক চলাকালেই রওশনের সামনে থেকে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, ‘পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জিএম কাদের জাপার চেয়ারম্যান নন। গঠনতন্ত্রে বলা আছে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন কাউন্সিলে। আর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ আপাতত দলীয় প্রধান হিসেবে সংগঠন পরিচালনা করবেন। তাছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত হবেন পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে। কিন্তু এখনও পার্লামেন্টারি পার্টির কোনো বৈঠক হয়নি। কাজেই জিএম কাদের স্পিকারকে যেই চিঠি দিয়েছেন সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ।’
আরো পড়ুন : ৮ সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চিঠি দেয়া হবে : ওবায়দুল কাদের
এবিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, মৃত্যুর আগে জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের দিয়ে যাওয়া লিখিত সিদ্ধান্ত ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই পার্টি পরিচালিত হচ্ছে। এখানে গঠনতন্ত্রের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতেই সকল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বক্তব্য জানার জন্য জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
রওশনের বৈঠক থেকে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এমপি ইত্তেফাককে বলেন, ‘কয়েকজন এমপির স্বাক্ষর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত করা যায় না। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ডাকতে হবে। সেখানে সর্বস্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী স্পিকারের মনোনীত একজন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ভোটাভুটি হবে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া ছাড়া হুট করে একটা চিঠি দিয়ে কেউ বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারেন না।’ এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, যেহেতু বিরোধীদলীয় নেতা (এরশাদ) নেই, সেই কারণে বিরোধীদলীয় উপনেতা (রওশন) পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ডাকবেন।
ইত্তেফাক/ইউবি
