বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য করে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা প্রদানের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। গত ৬ ডিসেম্বর ১১৫ তম কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এই সিদ্ধান্ত পেশ করা হয় এবং দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিকে ইতোমধ্যেই এই প্রত্যয়ের কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির এশিয়া অ্যান্ড দ্যা প্যাসিফিকের চেয়ার কংগ্রেসম্যান টেড ইয়োহো, কংগ্রেসম্যান ইলিয়ট এঙ্গেল, কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড শেরম্যান, কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাবট ও কংগ্রেসম্যান জেরি কনলি ও কংগ্রেসম্যান বিল কিটিং এই বিলটি উপস্থাপন করেন।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারাবদ্ধ। সেই প্রতিশ্রুতি এই রেজল্যুশনে পুনর্ব্যক্ত করা হলো।
আরো বলা হয় যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং নাস্তিকসহ সকলের মেলবন্ধনের এক সুন্দর আবাসস্থল গড়ে উঠে। যদিও বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি এবং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে।
কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার মতে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার ৬০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। খাদ্য শস্য উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ।গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘের মানদণ্ড পূরণ করে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে এবং আসা করা হচ্ছে আগামী ৩ বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উঠে আসতে সক্ষম হবে।
বলা হয়, ২০১৭ সালে মায়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর বর্মী সামরিক জান্তা ও তার নিরাপত্তা বাহিনী এক গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ পরিচালনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ৭ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে স্বাগত জানিয়ে এক মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে।
আরো উল্লেখ করা হয় যে, প্রত্যেক দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর হচ্ছে- একটি স্বাধীন, নিরেপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন।এজন্য সকল ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নির্বিগ্নে প্রবেশাধিকারের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা গ্রহণে প্রশাসনের জবাদিহিতা-স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভোটারের মৌলিক স্বাধীনতাকে সম্মান দেখানোই হচ্ছে একটি বৈধ নির্বাচনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট।
বলা হয়, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী একটি দেশের নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টিসহ ফলপ্রসূ ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব তৈরি করে। এছাড়া শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বৈশ্বিক শান্তির পথ সুগম হয় উল্লেখ করে বলা হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার হয়।
উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন বর্জন করেছিল।আসা করা হচ্ছে এবার আগামী ৩০ ডিসেম্বরে (২০১৮) বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
বলা হয়, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।
আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে- সন্ত্রাসবাদ, শান্তিরক্ষা, পরিবেশ ও জলবায়ু সহ শ্রমিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশ ইস্যুতে সহযোগিতা ও মূল্যবোধ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে।
অতএব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে মানবাধিকার,ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র সুরক্ষা করতে এবং বর্ধিত ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে দু'দেশের স্বার্থ বিনিময়ে সম্মানজনকভাবে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আরো সক্রিয় হতে চায়।
কংগ্রেস সভার সীদ্ধান্তে বলা হয়, 'অতএব এপ্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানান কংগ্রেসসভা এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রতি মনোযোগী হতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধে জানান।
এছাড়া, অনুরোধ জানানো হয়েছে রাজনৈতিক নেতা ও বিচার বিভাগকেও।বলা হয়েছে, সকল বাংলাদেশী যেন আসন্ন নির্বাচনে স্বাধীনভাবে নির্বিগ্নে ও নির্দ্বিধায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভোটারদের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানাতে হবে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য সরকার ও জনগণের প্রশংসা করেন কংগ্রেস সভা। এছাড়া বার্মিজ সেনাবাহিনী এবং সেদেশের সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণ হত্যা উল্লেখ করা হয়।
ইত্তেফাক/এমআই
