মোরগের ডাক ও মামলা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৪৫

চিররঞ্জন সরকার

সমাজ ও রাষ্ট্রের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আমরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অনেক কথা বলেছি। অনেক আলাপ-আলোচনা করেছি। কিন্তু তাতে আমাদের অবস্থা পালটায়নি। আসলে বদলানোটা খুব কঠিন কাজ। স্বভাব সহজে পালটায় না। তাই আজ আমরা চিরাচরিত এসব বিষয়ের বাইরে গিয়ে ‘মোরগ’ নিয়ে খানিকটা আলোচনা করব। অনেকে বিস্মিত হতে পারেন, জগতে এত কিছু থাকতে মোরগ নিয়ে আলোচনা কেন? মোরগ মানবসমাজে এমন কী কল্যাণ বা অকল্যাণ করেছে যে মোরগ নিয়ে আলোচনা করতে হবে? আসলে মোরগ নিয়ে আলোচনার অন্য একটা কারণ আছে। সে কারণে পরে আসছি। আগে মোরগ-বিষয়ে কিছু প্রাথমিক আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। 

মানবসভ্যতা বিকাশে মোরগ-মুরগির অবদান অপরিসীম। যদিও আমাদের দেশে শখ করে কিংবা মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য মোরগ-মুরগি পালনের প্রবণতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে গ্রাম থেকে শহরে মোরগ-মুরগি ও ডিম রপ্তানি হতো, এখন বিদেশ থেকেই আমদানি করতে হয়। এগুলো এখন গৃহস্থের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে বাণিজ্যিক লাভের আশায় খামারি ব্যবসার অংশ হয়ে গিয়েছে!

মোরগ-মুরগি গৃহস্থের পচা, বাসি, উচ্ছিষ্ট খাদ্যকণা খেয়ে গৃহস্থকে মিতব্যয়ী রাখে। এছাড়াও বাড়ির আশপাশের ঝোপজঙ্গলের পোকামাকড় খেয়ে গৃহস্থের বাড়তি উপদ্রব কমায়। খাদ্য তালাশের কারণে, গৃহস্থের বাড়ির চারপাশের হালকা পচা মাটি, নখ দিয়ে উলটিয়ে শুকিয়ে ঝরঝরে করে ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। গৃহস্থের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খানা খেয়েই মোরগ-মুরগি তার বংশ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে, ডিমের উত্পাদন বাড়ায়, মাংসের জোগান দেয়। সর্বোপরি গৃহস্থের জোগান দেওয়া খাদ্যের সঙ্গে, সে নিজেও সমপরিমাণ খাদ্য জোগাড় করে খায়, যার পুরো সুফল গৃহস্থের ঘরে যায়।

ছোটোবেলায় ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগে মোরগের ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙত। মোরগের ডাক শুনে আমরা বুঝতাম যে রাত পোহাবার আর বেশি বাকি নেই। যদিও আধুনিক মানুষ মোরগ-পোলাও পছন্দ করলেও মোরগের ডাক পছন্দ করে না (সম্প্রতি এক নিদ্রাকাতর ব্যক্তি মোরগের কাচা ঘুম ভেঙে যাবার পর বিরক্ত হয়ে ফেসবুকে লিখেছেন :শালার মোরগ! দ্রুত চোখের ডাক্তার দেখা। ভোরের আলো না ফুটতেই মধ্যরাতে ডাক পারা শুরু করছে, শালা পাগল! ইচ্ছে হচ্ছে জবাই করে খাই!)

ফালতু বিষয় নিয়ে মাতোয়ারা হতে শুধু আমরাই পারি না, উন্নত দেশগুলোতেও হরহামেশা এমন ঘটনা দেখা যায়। যেমন ফ্রান্সে গোল বেধেছে মোরগের ডাক নিয়ে। ভোরবেলায় মোরগের ডাক কি উত্পাত? নাকি ঐতিহ্য? এই প্রশ্নে উদেবল ফ্রান্স। যে মোরগটি এমন ঝামেলা পাকিয়েছে তার নাম মরিস। ফ্রান্সের ক্ষুদ্র এক দ্বীপে সে থাকে। এক সকালে সূর্যকে সরবে অভ্যর্থনা করে মরিস ঐ গ্রামে অবকাশযাপনরত এক দম্পতির অকালে নিদ্রাভঙ্গ করেছিল। আর যায় কোথায়, ঐ দম্পতি আদালতে চলে যান। মামলা ঠুকে বলেছেন, তাদের শান্তি নষ্ট করার জন্য সরে যেতে হবে মরিসকে। মরিসের মালিক স্বাভাবিকভাবেই তার মোরগের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিজের মনোভাব প্রকাশ করার অধিকার মোরগদের রয়েছে। এই বক্তব্যের সমর্থনে কয়েক হাজার ফরাসি নাগরিক স্বাক্ষর করেছেন। তাদের বক্তব্য, গ্রামজীবনের স্বাভাবিক শব্দ-গন্ধ দেশের ঐতিহ্য। সেইগুলোকে ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়ে সুরক্ষিত রাখতে হবে। শহর থেকে আসা শৌখিন পর্যটকদের সুবিধার জন্য সেগুলো বাতিল করা যাবে না। তাদের এই দাবি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। বিত্তবান পর্যটকদের দাবি মেনে এর আগে ফ্রান্সের একটি গ্রামে এক দম্পতিকে তাদের পুকুর বোজাতে হয়েছে। কারণ পুকুরের ব্যাঙগুলির শোরগোল পর্যটকদের বিরক্তি জাগিয়েছিল। আর একটি গ্রামে শহরবাসী নালিশ করেছিল, একটি বিশেষ ভবনের ঘণ্টা ভোর ৭টায় বেজে ওঠা বাড়াবাড়ি। এত তাড়াতাড়ি উঠবার প্রয়োজন কী? ক্ষুব্ধ হয়ে এক ছোটো শহরের মেয়র প্রশ্ন করেছেন, এরপর কি সমুদ্রের গর্জনও আপত্তিকর মনে হবে? কিংবা বাতাসের শব্দ? শহরবাসীর সুবিধার জন্য গ্রামের মানুষ ও প্রাণীদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রা বদলাতে হবে, এই প্রত্যাশা অন্যায়।

ফ্রান্সে এই বিতর্কটি নগরবাসী পর্যটকের স্বাচ্ছন্দ্যের দাবি বনাম গ্রামবাসীর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখবার দাবি, এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে যে বিষয়টি তা হলো, ঐতিহ্যের অঙ্গ হিসেবে শব্দের বিবেচনা। শহর বা গ্রামে ভগ্নপ্রায় প্রাসাদকে রক্ষা করতে সবাই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কারণ সেগুলি নিশ্চিহ্ন হলে ‘ঐতিহ্য’ হারিয়ে যাবে, এতে কারো সন্দেহ নেই। কিন্তু শহরের রাস্তায় হেঁকে-যাওয়া ফেরিওয়ালার ডাক, গ্রামে বৃষ্টির পরে ব্যাঙের কলরব হারিয়ে গেলেও যে অপূরণীয় ক্ষতি, সে বোধ সহসা জন্মায় না। শরতের শহর যদি ছাতিম ফুলের সুবাসে আমোদিত না হলো, যদি গ্রামের নয়ানজুলি থেকে জলমগ্ন পাটের গন্ধ না এলো, তবে উত্সবের আড়ম্বর বাড়িয়েও বাঙালি নিজ ঐতিহ্য হারাবে।

পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে পারিপার্শ্বিকের যত রূপ-গন্ধ-শব্দ-স্পর্শ অনুভব করা যায় তার সবই ‘ঐতিহ্য’, এমন নয়। কিন্তু যে অনুভূতিগুলি একটি জাতির সম্মিলিত বোধের মধ্যে প্রবেশ করেছে, ?আত্মপরিচিতির অংশ হয়ে উঠেছে, সেগুলি সংরক্ষণের যোগ্য। ঐতিহ্যের তালিকা নিয়ে অতএব চিন্তা প্রয়োজন। মোরগের ডাক আরো একটি প্রসঙ্গ তুলে এনেছে, তা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের। মানুষের মতে, সে সম্পর্কটি পুরাতন ভৃত্যের সঙ্গে মনিবের। যথেচ্ছ দুর্ব্যবহার করলেও প্রকৃতি মানুষকে তার প্রয়োজনের বস্তুটি নীরবে বাড়িয়ে দেবে, এমনই প্রত্যাশা। আরামপ্রিয় পর্যটকের মতো পুরো মানবসমাজই নিরন্তর নালিশ করছে, প্রকৃতি ইচ্ছামতো চলে তার বড়োই অসুবিধা করিছে। অগত্যা গাছ কেটে, জলাশয় বুজিয়ে, পাহাড় ফাটিয়ে সুবিধা করতে হয়েছে মানুষকে। আজ একটি মোরগকে সরাতে এত আপত্তি কেন, তাই আশ্চর্য বটে।

ছোটবেলায় সুকান্তর ‘একটি মোরগের কাহিনী’ পড়তে গিয়ে মোরগটার পরিণতির কথা ভেবে বেশ খানিকটা দুঃখবোধ হয়েছিল নিশ্চয়ই। সেখানে অবশ্য তার জীবনের অধিকারের বেশি আর কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। আসলে গল্পের মোরগ তো আর শুধু মোরগ হয়েই থাকে না। সে হয়ে ওঠে অনেকের, অনেক কিছুর প্রতিভূ। সমাজের খানিকটা অংশের আয়নাও। তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য-দীর্ণ গদ্যময় জীবনে, ক্ষয়িত সমাজব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই বেঁচে থাকার অধিকারটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু উন্নত দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটা মোরগের গল্প যে কখন জীবনের অধিকার ছাপিয়ে হয়ে উঠতে পারে জীবনযাপনের অধিকারের প্রতীক, সেটা বুঝতে, উপলব্ধি করতে, পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে একটা দীর্ঘ জীবনপথ।

যাহোক, মোরগবিষয়ক আলোচনার শেষ প্রান্তে এবার দুটি পুরোনো গল্প বলা যাক। এক ব্যক্তি মুরগির খামার দিয়েছেন। কিন্তু মুরগি ঠিকমতো ডিম দেয় না। একদিন রেগে গিয়ে ঐ ব্যক্তিটি মুরগিদের বলল, ‘কাল থেকে প্রত্যেকে যদি দুটি করে ডিম না দিস তবে জবাই করে খেয়ে ফেলব!’

পরদিন ঐ ব্যক্তিটি খামারে গিয়ে দেখল যে সব মুরগি দুইটি করে ডিম দিয়েছে। কিন্তু দুটি মুরগি একটি করে ডিম দিয়েছে।

প্রথম মুরগিকে ব্যক্তিটি বলল, ‘কিরে তুই একটা ডিম পেড়েছিস কেন?’

মুরগি বলল, ‘আমি দুটি ডিমই পেড়েছিলাম স্যার, কিন্তু একটি  ডিম চুরি হয়ে গেছে!’

পরের মুরগিকে সে বলল, ‘ওর তো ডিম চুরি হয়ে গেছে। তোর কী সমস্যা?’

পরের মুরগি মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি তো মোরগ হয়েও একটি ডিম দিয়েছি। আমার কাছে আর আশা করবেন না স্যার!’

পরিশেষে এক কাক আর মোরগের গল্প।

একটি দাঁড়কাক নিয়মিত একটা গাছের মগডালে বসে বসে ঝিমায়। কিছুই করে না। একদিন এক মোরগ এসে সেই গাছের তলায় দাঁড়াল। দাঁড়কাককে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা কাক ভায়া, তুমি যে সারা দিন এমন বসে বসে ঝিমাও তোমার খারাপ লাগে না?’ কাক জবাব দেয়, ‘খারাপ লাগবে কেন? আমার তো বেশ ভালোই লাগে। বসে বসে কত কী যে চিন্তা করি। মাঝে মাঝে নিজেকে দার্শনিক মনে হয়।’

মোরগ বলে, ‘আমারও খুব ইচ্ছে করে, কোনো কিছু না করে মাঝে মাঝে তোমার মতো ঝিমোই।’ কাক বলে, ‘ইচ্ছে করছে তো ঝিমোও। কে তোমাকে বারণ করেছে?’

এই কথা শোনার পর মোরগও বসে বসে ঝিমোতে লাগল। আহা ঝিমোনোতে কী শান্তি!

কাছাকাছি একটা শেয়াল ছিল ওত পেতে। মোরগটাকে ঝিমোতে দেখে সে সুযোগ বুঝে আক্রমণ করল এবং মোরগটার ঘাড় কামড়ে ধরে ছুটে পালাল!

গল্পের মর্মার্থ কী? যদি তুমি কোনো কিছু না করে কেবল ঝিমোতে চাও তবে অবশ্যই তোমাকে অনেক অনেক উঁচুতে অবস্থান করতে হবে!

n লেখক :রম্যরচয়িতা