বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা আশ্রয় দেওয়ায় ভূয়সী প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দেশটিতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত এবং গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত সহকারী মন্ত্রী অ্যালিস জি ওয়েলস গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপকমিটির এক শুনানিতে এ উদ্বেগের কথা জানান। তবে তিনি বলেন, সহিষ্ণুতা এবং বৈচিত্র্যের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে এবং বিশ্বে অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারে। এই শুনানিতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড শেরম্যান।
অ্যালিস ওয়েলস বলেন, এক দশক ধরে সাত শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে বাংলাদেশ আরো শক্তিশালী ও সম্পত্শালী হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। তবে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও স্বচ্ছ হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য অংশীদারের মতোই মনে করে। ঐ নির্বাচনের আগে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর পুলিশের দমন-পীড়ন ও ভীতিপ্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছি। ক্রম সংকুচিত কর্মক্ষেত্র ও নিষেধাজ্ঞামূলক খসড়া নীতিমালা সুশীল সমাজকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়ে সাংবাদিকরা অব্যাহতভাবে সেলফ-সেন্সরশিপের চর্চা করে যাচ্ছেন। এ আইনটি সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রণয়ন করা হলেও এতে অনেক ক্ষেত্রে বাক-স্বাধীনতাকে অপরাধে পরিণত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ সরকারের জন্য সুশীল সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ব্যক্তি ও দলগুলো যেন অনলাইনসহ সকল পর্যায়ে তাদের মতামত অবাধে ব্যক্ত করতে পারে এবং বিরোধী রাজনীতিকরা তাদের আইনসিদ্ধ ভূমিকা পালন করতে পারেন- তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন আরো গতিশীল হবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালের আগস্টের পর সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের স্বীকৃতি ও প্রশংসার দাবিদার। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে অবশ্যই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে আনান কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তবে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ‘স্থগিত’ চায় যুক্তরাষ্ট্র। স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা ভাসানচরকে বসবাসের জন্য উপযুক্ত হিসেবে উল্লেখ না করা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের পরিকল্পনা স্থগিত চান। তবে বাংলাদেশ জোর করে নয়, যারা স্বেচ্ছায় যেতে চায় তাদের সেখানে নিয়ে যেতে চায়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যুরো অব ডেমোক্রেসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার বিষয় সহকারী মন্ত্রী রবার্ট ডেস্ট্রো তার বক্তব্যে বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর স্বেচ্ছাচারী আটক ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।
শুনানিতে আসামের নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি এবং কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সহকারী মন্ত্রী ডেস্ট্রো।