মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ খাদ্য ও পানীয়। নবজাতকের স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইহার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইহা শিশুর জন্য উত্তম প্রতিষেধক। চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা বলেন, মাতৃদুগ্ধ পান শিশুকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি প্রভৃতি রোগ হইতে সুরক্ষিত রাখে। দাঁত ও মাড়ির রোগ এবং পূর্ণমাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ থাকে বলিয়া অস্থির রোগ রিকেট হইতেও রক্ষা করে। শুধু তাহাই নহে, মাতৃদুগ্ধ শিশু মৃত্যুর হার কমায় এবং শিশুর ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি প্রতিরোধ করে। এমনকি মাতৃদুগ্ধ পান করানোর কারণে মায়ের স্তন ক্যানসার হইবার ঝুঁকিও দূরীভূত হয়। এইসব উপকারিতা তখনই কার্যকর হইবে যখন মাতৃদুগ্ধ পান নিয়মিত ও বাধাহীন হইয়া থাকে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হইল, আমাদের সমাজে একজন মা ঘর হইতে বাহির হইলেই শিশুকে বুকের দুধ পান করা লইয়া এক মহা সমস্যায় পড়েন। অফিস-আদালত, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, বাস-লঞ্চ-রেলসহ বিভিন্ন স্টেশনে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আশার কথা হইল, সম্প্রতি এই প্রথম নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে মাতৃদুগ্ধ পানের পরিবেশ চাহিয়া ৯ মাস বয়সি শিশু উমাইর বিন সাদীর পক্ষে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করিয়াছেন তাহার মা। রিটে বলা হইয়াছে, কর্মক্ষেত্র, শপিংমল, বিমানবন্দর, বাসস্টেশন, রেলওয়ে স্টেশন প্রভৃতি স্থানে এমন পরিবেশে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করিতে হইবে যাহাতে কোনো মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করাইতে গিয়া কোনো অস্বস্তিবোধ না করেন বা কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার না হন। রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্যসচিব, সমাজকল্যাণসচিব, বিমান ও পর্যটনসচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হইয়াছে। উল্লেখ্য, সুন্দর, সুস্থ ও সবলভাবে শিশুর বাড়িয়া উঠিবার লক্ষ্যে এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করিতে সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মস্থলে ডে কেয়ার সেন্টার ও মাতৃদুগ্ধ দান কক্ষ স্থাপন করিতে ২০০৯ সালে নির্দেশনা দিয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এত বত্সর অতিবাহিত হইয়া গেলেও এই ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান উন্নতি পরিলক্ষিত হয় না। এখনো বেশির ভাগ কর্মক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েদের জন্য গড়িয়া উঠে নাই ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার। যেই হারে নারীশিক্ষা ও কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়িতেছে, তাহাতে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
কর্মস্থলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপদ ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার গড়িয়া তুলিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা, শপিংমল, কলকারখানা, পেশাজীবী সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে সোচ্চার ভূমিকা পালন করিতে হইবে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) রিপোর্ট অনুযায়ী আমাদের পাঁচ বত্সরের কম বয়সি শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ শিশু খর্বকায়, ৩৩ শতাংশ শিশুর ওজন কম এবং ১৪ শতাংশ শিশু কৃশকায় তথা লম্বার তুলনায় ওজন কম। ইহার কারণ শিশুকে যথানিয়মে মাতৃদুগ্ধ পান না করানো। আমাদের এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হার ৫৫ শতাংশ। অতএব, শিশুর পুষ্টিমান নিশ্চিত করিতে হইলে গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে মায়েরা প্রকাশ্যে ব্রেস্ট ফিডিং করাইলেও কেহ মনে কিছু করেন না। অর্থাত্ এই ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন করা আবশ্যক, যাহাতে কোনো মা এই ব্যাপারে অস্বস্তিবোধ না করেন।