যেখানে মানুষ বসবাস করে সেটাই তার বসতবাড়ি। সেটা গ্রাম কিংবা শহর যেখানেই হোক না কেন। বসতবাড়িতে ঘর কিংবা বাড়ির উঠোন ছাড়াও অনেক ফাঁকা স্থান থাকতে পারে। তবে শহরের তুলনায় গ্রামীণ বসতবাড়িতে বাসস্থানের ঘর ছাড়াও অনেক ফাঁকা স্থান থাকতে দেখা যায়। সেখানেই হতে পারে নানারকমের ফলের গাছসংবলিত ফলের বাগান। আগের দিনে বিশেষ করে গ্রামের সববাড়িতেই একটি করে বড়ো জঙ্গল বা ঝাড় থাকতে দেখা যেত। এখনো যে তা একেবারে দেখা যায় না তা নয়। তবে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি বাসস্থানের চাপে বসতবাড়িগুলো আগের তুলনায় অনেক সংকোচিত হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
ফল একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আঁশযুক্ত খাবার হিসেবে ফলের বিকল্প নেই। কারণ পুষ্টি বিজ্ঞানীদের পরামর্শমতে প্রতিটি মানুষের সুষমখাদ্যে কিংবা দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যে পরিমাণ পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অবশ্যই ফলমূল থেকে আসা অত্যাবশ্যক। আর সেটি দেশি ফল হলেই সবচেয়ে ভালো। সেক্ষেত্রে এমনিতেই বাড়তি জনসংখ্যার চাপে আবাদের জমি সংকোচিত হয়ে পড়ছে, অপরদিকে প্রতিদিনই ফলের চাহিদা বেড়ে চলেছে। কিন্তু আবাদি জমি কমার কারণে ফল উত্পাদন বৃদ্ধি না পেয়ে বরং কমছে। তাই পুষ্টিকর সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেজন্য কথা উঠছে যেভাবেই হোক না কেন ফল উত্পাদনের আওতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পতিত কিংবা অব্যবহূত জমি ব্যবহারের বিকল্প নেই।
বসতবাড়িতে যেখানেই ফাঁকা স্থান পাওয়া যায় সেখানে যে কোনো ধরনের ফলের গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানেই কেবল ফলের গাছ লাগালে ভালো ফল পাওয়া যায়। কিছু কিছু ফল রয়েছে যেগুলো হালকা রোদেও হয়ে থাকে। তারমধ্যে লেবু, পেঁপে, জাম্বুরা, কলা, ডালিম, ডেওফল, ডেউয়া, চালতা, আতাফল, জলপাই, মাল্টা, কমলা, কুলসহ আরো কিছু দেশি ফল। কাজেই বাড়ির আঙ্গিনাতে যেহেতু পুরোপুরি রোদ পাওয়া কঠিন সেজন্য সেখানে লাগানোর জন্য দেশি জাতীয় ফলের জাত নির্বাচন করাই উত্তম।
সারাবছরই গাছ লাগানো যায়, তবে গ্রীষ্মকালে বিশেষত বর্ষাকালে তা লাগানো উত্তম। কারণ সে সময় প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাটিতে প্রচুর রস থাকে। তাই লাগানো গাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। তাছাড়া বছরের অন্যসময় লাগালে প্রচুর সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। যাহোক বিশেষ যত্ন নিলে সবসময়েই লাগানো যায়, তবে শীতকালে গাছের বাড়-বাড়তি একেবারে থেমে থাকে। বসতবাড়িতে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জাতের ফলের সমাবেশ ঘটিয়ে মিশ্র ফলবাগান সৃজন করতে হবে। একেক জাতের ফল একেক সময়ে হয়ে থাকে। তাই সারাবছরই বসতবাড়ির ফলবাগান থেকে ফল পাওয়া সম্ভব যার দ্বারা পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বেশি হলে আর্থিকভাবেও লাভবান হওয়া যেতে পারে।
প্রতিটি ফলগাছ লাগানোর আগে বাড়ির আঙ্গিনার সবচেয়ে উঁচু জায়গাটি নির্বাচন করতে হবে। সেখানে একহাত দৈর্ঘ্য একহাত প্রস্থ ও একহাত গভীরতা বিশিষ্ট ঘন আকৃতির গর্ত করে সেখানে শুকনা গোবর বা অন্য জৈবসার, অল্প পরিমাণে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি একত্রে মিশিয়ে উক্ত গর্তে দিয়ে কিছু দিন ঢেকে রাখতে হবে। তারপর সেখানে মাটি দিয়ে ভর্তি করে ফলগাছের চারা লাগিয়ে মাটি দিয়ে ভরে তা স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু করে দিতে হবে। অতঃপর সেখানে চারার চেয়ে বড়ো একটি খুঁটি দিয়ে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হবে। তারপর অবস্থা বুঝে পানি দিয়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে প্রতি বছর যত্ন করাকেই বিশেষ যত্ন নেওয়া বলে। কাজেই বসতবাড়ির পতিত জায়গা কাজে লাগিয়ে সেখানে ফলের বাগান সৃজন করে সারাবছরই ফল উত্পাদন করে পুষ্টির চাহিদা মিটানো যায়।
n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়