ইন্টারনেট ও ফেসবুক বিড়ম্বনা

বিপ্লব বিশ্বাস

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে গত দশ বছর ধরেই নানা রকমের পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ এক্ষেত্রে এক বড় সাফল্য। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সতেরো কোটি। কিন্তু অনেকেরই একাধিক মোবাইল ফোন থাকায় গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় নয় কোটি আর প্রায় তিন কোটি রয়েছে ফেসবুক ব্যবহারকারী। দিন দিন এই সংখ্যা আরো বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই। ইন্টারনেট সংযুক্ত মোবাইল বর্তমানে অনেকের কাছেই এবং বিশেষ করে যুবসমাজের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দেশে গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্র মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা বিস্তৃত হওয়ায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষই এর সুবিধা ভোগ করতে পারছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, ব্যবসায়ীসহ যে কেউ ঘরে বসেই সারা বিশ্বের যে কোনো তথ্য সংগ্রহ এবং আদান-প্রদান করতে পারছে। বর্তমানে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ইমু, ইউটিউব ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত, জ্ঞানী, গুণী ব্যক্তিরাও বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারছেন। আর এভাবেই দেশ ও জাতি  নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি আবিষ্কারের আশীর্বাদ ও অভিশাপ—দুটি দিকই রয়েছে।  বাংলাদেশের মানুষ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক আশীর্বাদ যেমন উপভোগ করছে, তেমনি মাঝেমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির অভিশাপও তাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। স্কুল-কলেজগামী শিশু-কিশোর ও তরুণদের কাছে এখন লেখাপড়া বা খেলাধুলার চেয়েও ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ফোন অনেক বেশি প্রিয়। তারা চরমভাবে এর অপব্যবহার করে তাদের অতি মূল্যবান সময় নষ্ট করছে, যা দেশ ও জাতির জন্য এক অশনি সংকেত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশু-কিশোর ও তরুণরা নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর বিষয়ের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটনের প্রবণতাও বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে শুধু ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ই নয়, বরং অনেক সময় সমাজ এবং রাষ্ট্রও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ছে। ফেসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়া এবং সাম্প্রতিক ভোলার বোরহানউদ্দীনে চরম অশান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও গুজব রটিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। অর্থাত্ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিড়ম্বনাও কম নয়।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন আমাদের জন্য অপরিহার্য, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাব থেকেও দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এজন্য প্রযুক্তিগত বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত যে কোনো তথ্য বা সংবাদের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে বিশ্বাস করা বা অন্যকে জানানো উচিত নয়। আর শিশু-কশোর ও তরুণদের ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। তবে গণমাধ্যমকে এব্যাপারে পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য বা সংবাদ প্রচারকারী ও এদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প কিছু নেই।

ফরিদপুর