প্রবাসীর নিরাপত্তা

ডা. শায়লা শান্তা

 

প্রবাসজীবন—সে কি সুখের সাগরে ভেসে যাওয়া, নাকি অনেক কষ্ট মনের গভীরে চেপে রেখে বেছে নেওয়া জীবন; একমাত্র প্রবাসীরাই ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারেন। মানুষ প্রবাসে কেন যায়? হয়তো আর্থসামাজিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অথবা একটু ভালো থাকার আশায়। নিজের জন্মভূমি, পরিচিত পরিবেশ, পরিজন ছেড়ে প্রবাস জীবন বেছে নেওয়া নিশ্চয়ই খুব সহজ কিছু নয়। জীবনের অনেক কষ্ট, বেদনা ধামাচাপা দিয়ে প্রবাসীকে জীবন যাপন করতে হয়। নিজ দেশ ছেড়ে ভিন্ন ভূমি খুব সহজেই নিশ্চয়ই তাদেরকে আপন করে নেয় না, তার জন্য কঠোর পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কঠোর পরিশ্রম করে হয়তো কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য তাদের জীবনে ফিরে আসে। তারা প্রিয়জনের মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে অথবা নিজেরা একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে। বেশিরভাগ প্রবাসী কিন্তু তাদের উপার্জনের অর্থ রেমিট্যান্স হিসেবে দেশেই পাঠান। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এত কষ্ট, এত পরিশ্রম, দেশের জন্য  কর্তব্য, এর বিপরীতে দেশ থেকে কতটুকু নিরাপত্তা তাঁরা পান? আজকাল দুর্বৃত্তের সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছেন প্রবাসীরা। এই মানুষরূপী দানবগুলোর ধারণা, প্রবাসী মানেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, প্রয়োজন হলে তাদের মেরেকেটে টাকা-পয়সা, এমনকি জীবন লুটে নাও! কে এর দায়ভার নেবে? তাহলে কি প্রবাসীরাই অপরাধী? মানুষ কি প্রবাসে যাবে না, নাকি গেলেও স্বদেশে ফিরে আসতে পারবে না? প্রবাসীরা তাদের কষ্টের বিনিময়ে কতটুকু প্রতিদান পাচ্ছেন?

নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি। একবার দেশে ছুটিতে যাওয়ার দুই দিনের মধ্যেই বাড়িতে ডাকাতি হলো। বারান্দার গ্রিল কেটে মেহমানরা আসেন! তাদের হয়তো বোঝার ভুল ছিল, তারা একটা ফ্ল্যাটে ঢুকে জিজ্ঞেস করে, এখানে বিদেশ থেকে কারা এসেছে? ভাগ্যক্রমে আমরা ছিলাম অন্য একটি ফ্ল্যাটে। যা হোক, সেই ফ্ল্যাটে ঢুকে বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে সেই ফ্ল্যাটের তিনজনকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে; তারপর যা পায় তাই নিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়। ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মারা যেতে পারত, যদি না আমরা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সার ব্যবস্থা করতাম। ঘটনার পর স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, এই ঘটনার শিকার তো আমারই হওয়ার কথা ছিল? এরপর যে কয়দিন দেশে ছিলাম, রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের চিন্তাচেতনার এত অবক্ষয় কেন হচ্ছে? কে প্রবাসীদের নিরাপত্তা দেবে?

এর কি কোনো প্রতিকার নেই? একজন প্রবাসী চিকিত্সক হিসেবে আমার কষ্টগুলো শুধু আমিই উপলব্ধি করি। আমার সন্তান অসুস্থ থাকলেও তার সেবা করার সুযোগও আমার হয় না। আমাকে মানুষের চিকিত্সার জন্য ছুটতে হয়। এতকিছুর পরও মনে আশা জাগে—আমার দেশ একদিন সত্যিই সোনার বাংলা হবে, সোনার মানুষে ভরে যাবে দেশ, কিন্তু তার জন্য পদক্ষেপ তো দেশের মানুষকেই নিতে হবে।

প্রবাসী চিকিত্সক, সৌদি আরব