এক উপত্যকায় বাস করত একপাল হংস। একদিন হংস-সরদার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল, ‘হে মহানুভব, আপনি জানেন: আমি, আমার জাতিগণ পরম অহিংস। আমরা সবাই তৃণভোজী। হাজার বছর ধরে এ-ভূখণ্ড ছিল হিংস্র সব ভুজঙ্গের দখলে। আমরা রক্ত দিয়েছি। দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে দিয়েছি প্রাণ। মা-বোনেরা দিয়েছে সম্ভ্রম। কত কত বলিদান। তারপর পেলাম এই নতুন সূর্যটা—ফুলে-ফলে ভরে গেছে সবুজ বাগান। কিন্তু, এত বড় সাম্রাজ্য—লোকবল কম। আমাদের চাই বংশবৃদ্ধি—আরো আরো দলবল। কিন্তু সৃষ্টিগতভাবে তাতে আমরা অপারগ...’
ঈশ্বর মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘ভেবে দেখো, এটা কি ঠিক হবে? সংখ্যায় কম হলেও কম কি! যদি সে হয় সুসন্তান—তুমি তাকে যদি ঠিকঠাক গড়।’
হংসরাজ বলল আদবে, ‘মানছি হে ত্রাতা। তবু, জনবল সংকটে প্রশাসন বড় নড়বড়ে। সন্তান না হয় থাক। যদি দেন বর: কিছু বহিরাগত নিতে পারি দলে—সহায়ক—রাজকার্যে, শাসনে...’
ঈশ্বর বললেন, ‘হে হংস-বংশ, কেতাব খুলে দেখেছ কি? এই তো সেদিন—দুই শ বছর, তারপর আরো কিছুকাল—কী ঘটেছিল তোমাদের কপালে, বহিরাগত স্বাগতে! মনে রেখো: সাপুড়েকে কিন্তু সাপেই খায়।’
এবার হংস-সরদার হঠাত্ কুঁচকে গিয়ে, কাচুমাচু করে, জোড়-হাতে, বলল মাথা নামিয়ে, ‘ছি, ছি, জনাব। গোস্তাকি মাফ করবেন প্রভু। সে-রকমটি হবে না কিচ্ছুতে। যা হবার, সব নেয়া হবে দেশমাতৃকা থেকে—বেছে বেছে।’
ঈশ্বর খানিক ভাবলেন। তারপর অস্ফুট বললেন, ‘আচ্ছা...’
এল কাক,
পেঁচা;
ঈগল, চিল, শকুন,
হাড়গিলা, মদনটাক,
শেয়াল, বানর, কুমির,
কামোট;
চিতা, ছুঁচো, হাতি,
হায়েনা, অজগর...
পড়ে গেল সংকট। দৌড়, ঝাঁপ, ছুট...। হিমশিম, গলদঘর্ম, নাভিশ্বাস। সব নিঃশেষ—কোথাও আর গোলা-গোলা খাদ্য মেলে না। চতুর্দিকে গড়গড়, ঘোঁত্-ঘোঁত্—গর্জাচ্ছে মাংসাশী, মত্স্যভোজী। সে-কী ভয়ঙ্কর বিকট কোরদানি, গরদানি...
প্রতিদিন বারবার রাজপরিষদে বসছে মিটিং। তবু হচ্ছে না সমাধান: চাহিদামতো কী ভাবে জোগাবে দানা-পানি?
গোগ্রাসে গিলছে ঘাস,
কীট, পতঙ্গ, গাছ
কাঠ, পাথর, খাম্বা
রাস্তাঘাট, মসজিদ, মঠ
ভবন, সেতু,
ব্যাংক, বিদ্যালয়, প্রকল্প, বিকল্প,
নদী, নালা, লেক,
বহির্দান;
বন, জঙ্গল, মাঠ
রাজ্যপাট...
আর, হংসরাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়—দু-হাত তুলে ঊর্ধ্ব-আসমানে চিত্কার, আর্তচিত্কার: ঈশ্বর, ঈশ্বর, ঈশ্বর...
ঈশ্বর নিরুত্তর। আকাশ মেঘে ঢাকা। কে জানে ঈশ্বর থাকে কোনখানে?