হেমন্তে বর্ষার রূপ ঋতুচক্রের বিপর্যয়

আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টি থামছে না, ঝিরঝির করে ঝরছেই দিনমান। হেমন্ত এসে গেছে। অথচ মধ্য কার্তিকে প্রকৃতিতে বর্ষার আমেজ। কয়েক বছর ধরেই বাংলার ঋতুচক্রে যেন সময়োচিত আচরণ দেখা যাচ্ছে না। শীতে গরম। গরমে বর্ষা। ছয় ঋতুর বাংলা যেন এখন গ্রীষ্ম আর বর্ষা দুই ঋতুর সীমায় আবদ্ধ।

যদিও প্রাকৃতিক নিয়মে ভাঙাগড়ার খেলা প্রকৃতিতে অনাদিকাল ধরেই চলছে। প্রকৃতি এক নিখুঁত নিয়ম পদ্ধতিতে চলে। প্রকৃতির সেই সূক্ষ্ম নিয়ম পদ্ধতি বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে আধুনিক মানুষের অজস্র অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে। প্রকৃতির ভারসাম্যে অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপে অবাঞ্ছিত বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে। মানুষের তথাকথিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক উষ্ণতার চরম বৃদ্ধি ঘটিয়ে গ্লোবাল ক্লাইমেটকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই এমনটা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতি অসহায়। তার ঋতুচক্রের মনোহর রূপ বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষের আগ্রাসি উন্নয়নের থাবায়। শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা দিনের পর দিন বিরূপ হয়ে উঠছে। আর প্রকৃতি অস্বাভাবিক আচরণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে যে হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বজ পাতের হার বাড়বে বর্তমানের তুলনায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। একবিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই উষ্ণতার বৃদ্ধিও সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতে। বাড়ছে গরম। গ্রীষ্মকালে বাড়ছে বজ্রপাত।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘সাধারণভাবে আমরা বলি, সাগরে নিম্নচাপের কারণে এই বৃষ্টিপাত। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও লক্ষ করতে হবে যে সাগরে খুব ঘন ঘন নিম্নচাপের সৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে। ঝড়ের সংখ্যাও বেড়ে গেছে বিশ্ব জুড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন নিম্নচাপ বাড়ছে, ঝড় বাড়ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখব, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এর প্রধানতম কারণ।

ড. তৌহিদা রশীদ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকায় ভূমি ও সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়ছে। সমুদ্রের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে, অপর দিকে সাইক্লোন সৃষ্টি হচ্ছে। আর ভূমিতে বন উজাড় হয়ে কার্বন নিঃসরণ কমে যাওয়ায় উত্তাপ বাড়ছে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হতে দেখা যায়।

প্রতিদিন অতিমাত্রায় নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস উত্তপ্ত করে তুলছে পৃথিবীর পরিবেশমণ্ডল। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস অতি দ্রুত বৃদ্ধির প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত বনাঞ্চল ধ্বংস করে ফেলা, অতিমাত্রায় গাড়ি চালানো, শিল্পকারখানায় উত্পাদন মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার বিমান ব্যাপক ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ ফসিল গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ায়। এর স্পর্শে বিশ্বের বায়ুমণ্ডল উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতে হতে বদলে দিচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু বিভাগের উপপরিচালক মো. আব্দুর রহমান বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই প্রকৃতির এমন অস্বাভাবিক আচরণ। আর সারা বিশ্বের মানুষ জানে, ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

ঋতুচক্র দেশে দেশে

বিশ্ব সৃষ্টির পর থেকে ভূপৃষ্ঠের ভৌগোলিক চেহারায় রদবদল আর রূপান্তর এর আগে কতবার ঘটে গেছে, সেটা বলা খুব মুশকিল। তবে লক্ষ লক্ষ বছর আগের পৃথিবীর সঙ্গে আজকের পৃথিবীর মিল খুব কমই রয়েছে। দক্ষিণ গোলার্ধের অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের অ্যান্টার্কটিকা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৭০ মিলিয়ন বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা যখন সুপারকন্টিনেন্ট গ্লোয়ানার অংশ ছিল, তখন আজকের মতো বরফঢাকা ছিল না এই অঞ্চল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২৫ মিলিয়ন বছর আগেও যখন অ্যান্টার্কটিকা গ্লোয়ানা থেকে বিভক্ত হয়ে আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে গঠিত হতে শুরু করে, তখনো এর তাপমাত্রা আজকের মতো এমন হিমশীতল ছিল না। উষ্ণ তাপামাত্রায় ঘন বনাঞ্চল ছিল অ্যান্টার্কটিকার সব ভূমি। নানা রকমের প্রাণী ও গাছে অ্যান্টার্কটিকা তখন প্রাণময় এক সবুজ রাজ্য। তারপর ধীরে ধীরে পৃথিবী তার পূর্ব অবস্থান থেকে সরে আসার ফলে সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে এই বরফঢাকা অঞ্চলে পরিণত হয় অ্যান্টার্কটিকা।

সুতরাং ঋতুচক্র নির্ভর করে সূর্যের আলো কোথায় কীভাবে পৌঁছাচ্ছে তার ওপর। সে কারণে বিশ্বের সব দেশেই ঋতুর সংখ্যা অবশ্য সমান নয়। পৃথিবীপৃষ্ঠে তাদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভিন্নতার কারণে কোথাও বছরে একটি, দুটি অথবা তিনটি ঋতুর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। কোথাও আবার ঋতুর সংখ্যা চার কিংবা ছয়। যেমন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ অষ্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড, রাশিয়া ও জার্মানি প্রভৃতি দেশে চারটি ঋতু দৃশ্যমান। এশিয়া মহাদেশের অনেক অঞ্চলেও এই চার ঋতুই প্রকৃতিতে দৃশ্যমান। যেমন জাপান, চীন, কোরিয়া ও ভারতের বেশির ভাগ অঞ্চল। অতি শুষ্ক অথবা মরুভূমির দেশে ঋতু শুধু গ্রীষ্ম আর বর্ষা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাগরদেশ ফিলিপাইনেও দুটি ঋতুই দেখা যায়। তবে পরিবেশবিদেরা মৃদু তাপমাত্রার কয়েকটি অঞ্চলকে ছয় ঋতুর মডেল হিসেবে উল্লেখ করলেও সুস্পষ্ট পার্থক্যে ষড়্ঋতুর উপস্থিতি কেবল বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার কিছু অংশ ছাড়া অন্য কোথাও সেভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে অস্তিত্ব ঘোষণা করে না। এই ষড়্ঋতু হলো গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত।