বন্ধ করতে হবে গণমাধ্যমে বিকৃত চর্চা

ছোটোবেলা থেকে যখন কোনো মানুষ সিনেমা দেখা শুরু করে তখন থেকেই হয়তো তার মধ্যে অভিনেতা কিংবা সেলিব্রেটি হওয়ার স্বপ্ন জাগে। ছোটোবেলা থেকেই তাই হয়তো অনুসরণ করা হয়ে থাকে পছন্দের নায়ককে; কিন্তু নায়ক হয়ে ওঠা হয় না আর বাস্তব জীবনে, ইচ্ছা হয়তো থেকে যায় স্বপ্ন হয়েই।

একটা সময় ছিল যখন স্কুলে পড়তাম তখন প্রতি শনিবার ক্লাসে হয় রুবেল হয়ে কেউ মারামারি করছে, হাই জাম্প মেরে কিক দিচ্ছে আবার কেউ মাথায় রুমাল বেঁধে চোখে সানগ্লাস পরে সালমান শাহ হয়ে ভাব নিচ্ছে। বস্তুত নায়ক হওয়ার একটা যেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা এটা প্রায় সবার ভেতর ছিল। হয়তো ঘুমানোর আগেও আমরা যেই কল্পনার জগত্ বানাই সেখানেও হয়তো সবাই নিজেকে একবার হলেও নায়কের সারিতে রেখেছে। বাস্তব জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো হারিয়ে গেছে এমন অনেক নায়ক; কিন্তু রয়ে গেছে ঠিকই সেলিব্রেটি হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা।

বর্তমান সময়ে সেলিব্রেটি শব্দটার খুব একটা ব্যবহার হয় না এখন আর। গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা এখন সেটার বদলে ব্যবহার করে থাকি ‘ভাইরাল’ নামক শব্দটি। যার ফলে অনেকেরই এখন সেলিব্রেটি হওয়ার ইচ্ছার বদলে ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছা জাগে। সেলিব্রেটিকে যেমন সবাই চেনে, তেমনই ভাইরাল হওয়া ব্যক্তিকেও সবাই চেনে। ভাইরাল হওয়ার ফলে হয়তো কোনো অজানা আত্মতৃপ্তি থাকে। যেই তৃপ্ততা মেটাতেই সবাই এর স্বাদ গ্রহণ করতে চায়।

আকাঙ্ক্ষা কিংবা ইচ্ছা থেকে সাধারণত মানুষ ভাইরাল হওয়ার যে সহজ পন্থাটা বেছে নেয় তা হচ্ছে ফেসবুক কিংবা অন্যান্য গণমাধ্যম। ভাইরাল হওয়ার জন্য যার যা ইচ্ছা তাই করছে। কেউ এসে ফেসবুকের লাইভে বসে মদ খাওয়ার ভিডিও করছে, কেউবা অশ্লীলতা, কেউ কেউ আবার টিকটক ভিডিওর মাধ্যমে বিকৃত অঙ্গভঙ্গি সঞ্চালন করে তা প্রকাশ করছে। কে কী করছে কিংবা সমাজের ক্ষেত্রে তা কতটুকু উপযোগী তার কোনো বাছবিচার নেই। শুধু টার্গেট একটাই, ভাইরাল হওয়া।

ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে প্রায় সবার হাতেই এখন ফেসবুক থাকায় দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী—এমনকি রিকশাচালক, কাঠমিস্ত্রিসহ প্রায় সব শ্রেণির  মানুষ তা ব্যবহার করছে। যার ফলে দেখা যায় শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের একটা বড়ো অংশই অশিক্ষিত অসচেতনদের কাতারেই মানুষ বেশি আগ্রহী হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অশ্লীল ভাষায় কোনো রাজমিস্ত্রি কিছু একটা বলে ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করল, আরেক জন ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী সেটা আবার কপি করে নিজের মতো করে পাবলিশ করল। কিংবা কোনো এক হুজুর ওয়াজে অহেতুক কিছু বলল, সেটা আবার টিকটকের মাধ্যমে কিছু শিক্ষার্থী তা নকল করে আবার বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ভিডিও করে প্রকাশ করে।

ভাইরাল হওয়ার জন্য এই নীতিটা যেন গণমাধ্যমে একটা ভাইরাসের মতো হয়ে গেছে। যেই ভাইরাস একজন আরেক জনকে আক্রমণ করছে এবং গণমাধ্যমের রোগী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব বিকৃতমনা কর্মকাণ্ড যেন এখন অনেকের কাছে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে। মানুষের সার্বিক জীবন-যাপনে যেন বিনোদনের অংশ হিসেবে হয়ে গেছে এসব বিকৃতমনা।

এসব অপসংস্কৃতি চর্চার ফলে গণমাধ্যমে নতুন প্রবেশকারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে বিড়ম্বনা ও পড়ছে এর ক্ষতিকর প্রভাব। যার ফলে সাংস্কৃতিক চর্চা, বই পড়া, ভালো কিছু অনুসরণের বদলে ধাবিত হচ্ছে এসব বিকৃত কর্মকাণ্ডে। যার ফলে কিশোরবয়সি ছেলেমেয়েদের একটা বড়ো অংশ হুমকির মুখে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এদের জ্ঞান সীমিত হওয়ায় ভালোমন্দ অনুধাবন ক্ষমতা না হওয়ায় এরাও সাময়িক বিষয়গুলোতে ঝুঁকে পড়ছে যা নিঃসন্দেহে ক্ষতিকারক।

শুধু নেতিবাচক দিক নয়, গণমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অনেক ইতিবাচক দিকেরও নজির রয়েছে। যেখানে কেউ ফেসবুক লাইভে এসে দেশের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরছে, আবার কেউ লাইভে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছে আবার কেউ কেউ ইতিবাচক অভিনব শিক্ষণীয় বিষয় নিয়েও ভাইরাল হয়েছে এই গণমাধ্যমে। যা শুধু শিক্ষার্থীই নয়, দেশবাসীর জন্যও কল্যাণকর।

তাই আমাদের সবার উচিত বিকৃতমনা পরিহার করে সঠিকভাবে সংস্কৃতি চর্চা করা এবং গণমাধ্যমকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করে নতুন গণমাধ্যম ব্যবহারকারীদের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার। একই সঙ্গে নতুন ব্যবহারকারী বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রতি উপদেশ রইল গণমাধ্যম থেকে নেতিবাচক কিছু গ্রহণ না করে ইতিবাচক দিক গ্রহণ করা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জেড এইচ সিকদার ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি