মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি টালমাটাল, বিমলের পর আরো ছয় নেতার বিদ্রোহ

রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতে অভ্যন্তরীণ সংকট আরো ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। দলটির পলিটব্যুরোর প্রবীণ সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাসের দল থেকে পদত্যাগের পর এবার ‘বিদ্রোহ’ করলেন দলটির ১১ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পুলিটব্যুরোর আরো দুই সদস্যসহ কেন্দ্রীয় ছয় নেতা। ‘দল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণপন্থী, বিলোপবাদী ধারায় অধঃপতিত সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতিগ্রস্ত’—এমন অভিযোগ এনে এই ছয় নেতা গতকাল সোমবার দলের আসন্ন দশম কংগ্রেস বা জাতীয় সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে মেননের পার্টি আরেক দফা প্রায় নিশ্চিত ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

আগামী ২-৫ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় কংগ্রেস প্রত্যাখ্যান করা ছয় নেতা হলেন—পলিটব্যুরোর সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ এবং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জাকির হোসেন হবি, মোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু, অনিল বিশ্বাস ও তুষার কান্তি দাস।

গতকাল এক যুক্ত সংবাদ বিবৃতিতে এই ছয় নেতা অভিযোগ করেন, পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিভিন্ন জেলায় অবিশ্বাস্য সংখ্যক পার্টি সভ্যপদ প্রদানের মাধ্যমে ভুয়া  প্রতিনিধিদের দশম কংগ্রেসে উপস্থিত করানোর সব আয়োজন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তাই নতজানু আপসকামী নীতি পরিহার করে আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতে আমরা কংগ্রেসে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তারা বলেন, ১৯৯২ সালের ৪ মে ঐক্য কংগ্রেসে গৃহীত মতাদর্শগত, নীতি-কৌশল থেকে পার্টি ক্রমান্বয়ে দক্ষিণপন্থি, বিলোপবাদী ধারায় অধঃপতিত হয়েছে। ঐক্য কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল কমিউনিস্ট ঐক্যকে      এগিয়ে নেওয়া এবং বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামই হবে পার্টির ভিত্তিমূলক কাজ। পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব ঐক্য কংগ্রেসের মতাদর্শগত নীতি-কৌশল ও সংগঠন সম্পর্কে গৃহীত ভিত্তি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে।

ইতিমধ্যে পার্টি তার সংগ্রামী ভাবমূর্তি হারিয়ে ফেলেছে উল্লেখ করে ছয় নেতা বলেন, দল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পার্টি ও তার গণসংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে। ১৪ দলের সঙ্গে কর্মসূচিভিত্তিক ঐক্য, ‘হাতুড়ি’ মার্কা ছেড়ে ‘নৌকা’ প্রতীকে নির্বাচন এবং সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের মাধ্যমে পার্টির নীতি আদর্শকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। এই ভ্রান্তনীতির অনুসরণের ফলে পার্টির অগণিত নেতাকর্মী এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, বরিশালের জেলা সম্মলনে দলের কর্মী এবং জনগণের দাবির মুখে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের নির্বাচন সম্পর্কে পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন যে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, পরদিন তার ইউটার্ন পার্টি অনুসৃত বর্তমান রাজনীতিরই অনিবার্য ফল।

বিবৃতিতে তারা আরো বলেন, ওয়ার্কার্স পার্টি বর্তমানে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আজ রাজনৈতিক দুর্নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক দুর্নীতিতেও আক্রান্ত। বাস্তবতার নামে বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির রাজনৈতিক লাইন ও জোটনীতি তথা আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্থায়ী ঐক্যের যে নীতি-কৌশল গ্রহণ করে চলেছে তাতে ওয়ার্কার্স পার্টি দেউলিয়া পার্টিতে পরিণত হয়েছে। আন্তঃপার্টি সংগ্রামকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে।

এই ছয় নেতা বলেন, স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক কংগ্রেস অনুষ্ঠানে পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় পার্টির সভ্যপদ যাচাই-বাছাই করার প্রস্তাব আমরা উত্থাপন করেছিলাম। এ কথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, পার্টির সভ্যপদ যাচাই না করে অবৈধ প্রতিনিধিদের নিয়ে পাটির্র কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হলে তা হবে অবৈধ। লাল পতাকাকে সমুন্নত রাখতে দক্ষিণপন্থি সুবিধাবাদকে পরাস্ত করে সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি, কমিউনিস্ট ঐক্য, বাম-গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তুলতে সব পার্টি কমরেডদের এই প্রহসনের কংগ্রেসে অংশগ্রহণ না করার আহ্বানও জানান এই ছয় নেতা। বিবৃতির শেষদিকে ছয় নেতা বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়, দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে আর ১৪ দল ও সরকার নয়, পার্টির স্বাধীন ভূমিকা নিতে হবে।

এদিকে, দলের ভেতরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পলিটব্যুরোর সভা ডেকেছে ওয়ার্কার্স পার্টি। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় এই সভায় ২-৫ নভেম্বর দশম পার্টি  কংগ্রেসের প্রস্তুতির সার্বিক বিষয়ে আলোচনা করা হবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।