শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

বুদ্ধিজীবী হত্যা

ভেবে অবাক হতে হয়, শব্দ তিনটির কী চমত্কার অর্থ, অথচ আজ আমাদের কাছে তা শুধু ঘৃণ্যই নয়, ভয়াবহ; চিন্তা করলে মনে হয় একদল হিংস্র নেকড়ে মানুষের রক্ত পান করার জন্যে উত্কট উল্লাসে ধেয়ে আসছে। শব্দ তিনটি রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস। রাজাকার অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। শব্দটির প্রথম অংশ ‘রাজা’ আরবি, দ্বিতীয় অংশ ‘কার’ ফারসি। ‘রাজা’ অর্থ ইচ্ছা, ‘কার’ অর্থ কাজ। আল-বদর অর্থ পূর্ণিমার চাঁদ। শব্দটি আরবি। আল-শামস অর্থ সূর্য। এ শব্দটিও আরবি।

অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এই শব্দ তিনটির পরিচয়ে পরিচিত বাংলাদেশেরই কিছু মানুষ বাঙালিদের হত্যা করেছে হাসতে হাসতে, হত্যা করতে সাহায্য করেছে হাসিমুখে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও ঘাতকদের হাতে তুলে দিয়েছে অবলীলায়, নির্বিকারভাবে। মানুষ সে সময় এদের নাম শুনলে ভয়ে আঁতকে উঠত। মনে হতো কখন কার ঘরে হানা দিয়ে কোন সর্বনাশটা করে রেখে যাবে। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেই রাজাকার সৃষ্টি; আল-বদর, আল-শামস সৃষ্টি হয়েছে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে।  রাজাকাররা পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করেছে, রাস্তাঘাট চিনিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে, ঘরবাড়ি পোড়ানো ও লুণ্ঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আল-বদর ও আল-শামসদের তত্পরতা ছিল কিছুটা ভিন্ন, তাদের ব্যবহার করা হয়েছে শিক্ষিত লোকদের চিহ্নিত করার কাজে, হত্যা করার কাজে। বুদ্ধিজীবী হত্যা প্রসঙ্গে আল-বদর, আল-শামস নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।

বুদ্ধিজীবী হত্যা পরিকল্পনা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নয়, পঁচিশে মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার সময় থেকেই।  আমরা দেখেছি একাত্তরের সেই ভয়াবহ কালরাতে বাঙালি দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, সেনাবাহিনী, তত্কালীন ইপিআর, পুলিশদেরই শুধু হত্যা করা হয়নি, করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও, তাঁদের অনেকে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও খ্যাতিমান। তাঁরা বুদ্ধিজীবী হিসেবেও সুপরিচিত, সম্মানিত। এঁরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নামতে পারেন না; পারেন না জননেতাদের মতো মানুষকে মিছিলে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করাতে; কিন্তু দিতে পারেন সেই শিক্ষা, যা মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে, শাণিত করতে প্রেরণা জোগায়, সঠিক পথটি চিনতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। হত্যাকারীদের চোখে এসব মানুষ আরো বিপজ্জনক, এরা এমন অমোঘ বাণী শোনায় যাতে দীক্ষা নিয়ে ঠিক শনাক্ত করে ফেলে কে শত্রু, কে মিত্র। শিক্ষক হত্যা করলে দেশের শিক্ষার প্রসার ব্যাহত হবে, নিরক্ষতার আবর্তে একবার ফেলে দিতে পারলে চিরকাল চোখে ঠুলি পরিয়ে ইচ্ছামতো চালিয়ে নেয়া যাবে, অতএব শিক্ষক শূন্য করতে হবে। সাংবাদিক রাখা চলবে না। এরা সঠিক সংবাদ জানায়, তা চলতে দেয়া যায় না। ডাক্তার মানুষকে নিরাময় করে তুলে জীবন-শক্তি ফিরিয়ে দেবে এ চিন্তা ছিল তাদের কাছে অকল্পনীয়; প্রকৌশলী মানুষের উন্নত জীবন যাপনে সহায়তা করবে এটা অসহ্য; আর শিল্পী সাহিত্যিক মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে মার্জিত ও পরিশীলিত করবে এ ধারণা তাদের কাছে কখনোই প্রশ্রয় পেতে পারে না; এক কথায় শিক্ষক-সাংবাদিক-চিকিত্সক-প্রকৌশলী-শিল্পী-সাহিত্যিক, যাঁরাই জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে তাদের বিনাশ করতে না পারলে আবার কে কবে মাথা চাঁড়া দিয়ে জাতিকে জেগে ওঠার মন্ত্র দেবে কে জানে। বাংলাদেশকে চিরকালের জন্যে পঙ্গু করে দেবার উদ্দেশ্যেই সুপরিকল্পিতভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে হত্যা করা শুরু হয়। তাদের সহযোগী ছিল এ-দেশেরই কিছু মানুষ, যারা পশুর চেয়েও অধম। অথচ বেদনার কথা, এদের আজ অনেকেই দেশে ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, তাদের বিবেক পীড়িত নয়, বরং উল্লসিত।    (অংশ)