গ্রামে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা এখনো বহু দূরে

দেশের সিংহভাগ মানুষ মফস্সলে বসবাস করে, অথচ একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও তাহারা ন্যূনতম চিকিত্সাসেবা পাইতেছে না। দেখা যাইতেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হইলেও কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের শুধু অবহেলার কারণে অনেক স্থানে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাইতেছে না সাধারণ মানুষ। অথচ তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়িয়া তোলা হইয়াছে। নিয়োগ দেওয়া হইতেছে নূতন নূতন চিকিত্সক। চিকিত্সকরা তৃণমূল স্তরে না থাকিলে তাহাদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারিও একাধিকবার উচ্চারণ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। কিন্তু বিদ্যমান বিবর্ণ চিত্র উজ্জ্বল হইতেছে না কিছুতেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রায় ২০ দশমিক ৪ শতাংশ পদ খালি পড়িয়া রহিয়াছে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি এবং কর্মকর্তাদের যথাযথ নজরদারির অভাবে দেশের অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সরঞ্জাম কোনো কাজে লাগিতেছে না। বহু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিন, অপারেশন থিয়েটার, সার্জারি মেশিনগুলি নষ্ট হইয়াছে অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া।

সুতরাং কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাইলেই কিংবা কিছু চিকিত্সক নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হয়। চিকিত্সকরা কর্মস্থলে থাকিতেছেন কি না, তাহাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করিবার জন্য ছয়টি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। ইহা হইল—প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, চিকিত্সকসহ পর্যাপ্ত জনবল, চিকিত্সা-সরঞ্জাম, তথ্য-উপাত্ত, সেবাদানের সঠিক নির্দেশিকা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা। ইহার যে কোনো একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি ঠিকভাবে কাজ করিতে পারে না। বাংলাদেশের মফস্সল পর্যায়ে এই ছয়টি অনুষঙ্গের মধ্যে একাধিক বিষয়ের ঘাটতি থাকে প্রায় সকল সময়ই। কোনো একটি উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে যে পরিমাণ ওষুধ ও যন্ত্রপাতি দরকার, তাহা না থাকিলে কিংবা সিভিল সার্জন অফিস হইতে তাহা ঠিকমতো বণ্টিত না হইলে যথাযথ চিকিত্সাসেবা অধরাই থাকিয়া যাইবে। অর্থ, চিকিত্সা সরঞ্জাম ও জনবলের সবকিছু থাকিলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে নামকাওয়াস্তে স্বাস্থ্যকাঠামো তৈরি হইতে পারে বটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হইবে না।

চিকিত্সাসেবার সর্বপ্রধান শর্তই হইল চিকিত্সকের উপস্থিতি। অথচ দেশের বেশির ভাগ উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স চলিতেছে এক বা দুই জন ডাক্তার দিয়া, যেইখানে প্রয়োজন ৯ হইতে ২১ জন চিকিত্সক। অভিযোগ রহিয়াছে যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হইতে গ্রামের হাসপাতালে বদলি ও পদায়ন করা হইলেও সরকারি দলের চিকিত্সক নেতাদের প্রভাব খাটাইয়া গ্রাম হইতে চলিয়া আসেন ঢাকায় বা অন্য বিভাগীয় শহরে। অনেক সময় গ্রামের হাসপাতালে না গিয়াই শহরে বসিয়া বেতন নেন মর্মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হইয়াছে নানান সময়ে। আর গ্রামের মানুষেরা তো আইসিইউ ও সিসিইউ চিকিত্সাসেবার কথা চিন্তাই করিতে পারে না। সরকারি পর্যায়ে এই সেবার অভাবেও সংকটাপন্ন রোগীরা অহরহ মারা যাইতেছে গ্রামে। প্রশ্ন হইল, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার ছাপ কেন থাকিবে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে? তৃণমূল স্তরে সমস্যার নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যথাযথ সিদ্ধান্তের অবহেলা কবে দূর হইবে?