চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের পুরোনো বিরোধ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সহধর্মিণীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধের সূত্রপাত। তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের বিরুদ্ধে খেপেছেন হাসিনা মহিউদ্দিনের অনুসারীরা। এমনকি এর জন্য নাছিরকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অবশ্য আ জ ম নাছির বলেছেন, মঞ্চে কারা বসতে পারেন তা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। তাই মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়।
এদিকে এ ঘটনায় গত রবিবার চট্টগ্রামের ছয় সাংগঠনিক জেলার প্রতিনিধি সভা শেষে হাসিনা মহিউদ্দিনের সমর্থকরা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। গত সোমবার নগরীতে মিছিল-সমাবেশ করেন। এমনকি ঐদিন রাতে একটি স্মরণসভায় মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং আ জ ম নাছির সমর্থকদের মধ্যে পালটাপালটি বিক্ষোভ ও স্লোগানের মধ্যে নাছির স্মরণসভায় অংশগ্রহণ করেননি।
জানা গেছে, মহিউদ্দিন চৌধুরী ও নাছিরের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। মূলত চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মধ্যে বিরোধ ছিল। সে সময় আ জ ম নাছির উদ্দীন ছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর পক্ষে। মাঠপর্যায়ে ঐ দুই নেতার সমর্থনে ছাত্রলীগের আলাদা অবস্থান ছিল। এ নিয়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে বহু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষ ছেড়ে আ জ ম নাছির নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। সে সময় মহানগর কমিটির দায়িত্বে প্রথমে এম এ মান্নান সভাপতি এবং মহিউদ্দিন চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে মহিউদ্দিন চৌধুরী সভাপতি এবং ইনামুল হক দানু সাধারণ সম্পাদক হন। এরই মধ্যে আ জ ম নাছির বহু চেষ্টার পরও মহানগর আওয়ামী লীগে স্থান করে নিতে পারেননি। ইনামুল হক দানুর মৃত্যুর পর গত মেয়র নির্বাচনের পূর্বে আ জ ম নাছির কেন্দ্রের সহায়তায় সরাসরি মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। এরপর মেয়র নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পুনরায় প্রার্থী না দিয়ে আ জ ম নাছির উদ্দিনকে মেয়র হিসেবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হয়। নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যন্ত ছাত্রলীগের বিবদমান দুটি গ্রুপ রয়েছে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার অনুসারিগণ তার পুত্র ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং হাসিনা মহিউদ্দিনের সঙ্গে থেকে যান। যদিও কিছু নেতাকর্মী মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে চলে গেছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো পূর্বের বিভক্তি স্পষ্ট। চট্টগ্রামের নেতাকর্মীদের বিভক্তির কারণে নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে মঞ্চে উঠতে না দেওয়ায় গত দুদিন ধরে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ বিবৃতি পালটা-বিবৃতি তারই প্রতিফলন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তাছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে হাসিনা মহিউদ্দিনও মেয়র পদের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসায় তার সমর্থকগণও এ নিয়ে তাদের অবস্থান জানান দিতে গত সোমবার হাসিনা মহিউদ্দিনের পক্ষে একাধিক শো-ডাউন করেছে বলে অনেকের অভিমত।
এদিকে এক বিবৃতিতে সংগঠনের শৃঙ্খলাকে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের ছয় শীর্ষ নেতা। আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম, দক্ষিণ জেলা শাখার সভাপতি মোছলেম উদ্দীন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান এক যুক্ত বিবৃতিতে সংগঠনের স্বার্থ-শৃঙ্খলাকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘গত ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের ছয় সাংগঠনিক জেলার প্রতিনিধি সম্মেলন নগরীর ‘দি কিং অব চিটাগাং’ কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ২৬ অক্টোবর রাতে সার্কিট হাউজে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম এমপির উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয় প্রতিনিধি সভায় মঞ্চে আসন গ্রহণ করবেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, চট্টগ্রামের মন্ত্রিগণ, ছয় সাংগঠনিক জেলার সংসদ সদস্য, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সহ-সভাপতি এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকগণ। প্রতিনিধি সভায় কারা কারা বক্তব্য রাখবেন সেটাও নির্ধারণ করা হয় এবং সেই মতো সভা পরিচালিত হয়। কিন্তু সুশৃঙ্খল এই সুন্দর অনুষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত করতে কিছু অপরিণামদর্শী ব্যক্তি অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। সংগঠনের ঐক্য ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার জন্য এই ধরনের তত্পরতার আমরা নিন্দা জানাই।’