সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

অপরাধ করে কেউ পার পাবেন না

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অপরাধী অপরাধীই। অপরাধ করে কেউ পার পাবেন না, সবাইকে ধরা হবে। কখন কাকে ধরা হবে, তা সময়ই বলে দেবে। অপেক্ষা করুন। আর জীবনের ভয় বলে কোনো কথা আমার ডিকশনারিতে নেই। ভয় থাকলে এমন অভিযানে নামতাম না। আর আমি যখন নেমেছি, তখন কে কী করে, পরিবারের কেউ কি না, কোন দলের সেটি আমার কাছে বিবেচ্য বিষয় না। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে ‘আইওয়াশ’ বলে বিএনপির অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার গণভবনে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। গত ২৫ ও ২৬ অক্টোবর আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত ১৮তম ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ এবং অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে ঘুরে ফিরেই দেশের চলমান শুদ্ধি অভিযান, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের হঠাত্ ধর্মঘট, সাকিবের বিরুদ্ধে আইসিসির নিষেধাজ্ঞা আরোপ প্রসঙ্গ ছাড়াও দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক বিষয়গুলো উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা (বিএনপি) আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ, যাদের বিরুদ্ধে খুন-দুর্নীতি-অগ্নিসন্ত্রাস-অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে, যে দলের শীর্ষ দুজনই দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত, তারা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়ে কথা বলে কোন মুখে, কোন সাহসে? বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইসিসির নিষেধাজ্ঞা জারি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বলেছে, তারা সাকিবের পাশে থাকবে। বিসিবি সব সময় সাকিবের সঙ্গে আছে এবং সব রকম সহযোগিতা দেবে। তবে আইসিসি যদি কোনো ব্যবস্থা নেয়, সেক্ষেত্রে তো এখানে আমাদের খুব বেশি কিছু একটা করণীয় থাকে না।

ক্যাসিনো কাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের এক হাত নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এত দিন ধরে ক্যাসিনো পরিচালিত হয়ে আসছে, আপনারা (সাংবাদিক) তো কেউ কোনো নিউজ করলেন না? আমারও প্রশ্ন, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে এ রকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছে কেউ জানে না? খোঁজ করলে সাংবাদিকদের ভেতরেও হয়তো ক্যাসিনোতে জড়িত কাউকে পাওয়া যাবে। তখন কী হবে? তবে মানুষ যখন অপরাধের সঙ্গে জড়ায় হয়তো প্রথম কেউ জানে না। কিন্তু একপর্যায়ে তাকে ধরা পড়তেই হবে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, আমি ছোটোবেলা থেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। আমার বাবাকে (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু) দেখেছি কীভাবে সাহসের সঙ্গে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। কাজেই ‘ভয়’ শব্দটা আমার ছোটোবেলা থেকেই নেই। ভয় পাওয়ার লোক আমি না। বিএনপিকে ‘দুর্নীতির খনি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির দুয়ার খুলে দিয়েছিল জিয়াউর রহমান। হত্যা, খুন, দুর্নীতি, অগ্নি-সন্ত্রাস—এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা করেনি। সেই দলের নেতা যিনি চেয়ারপারসন (খালেদা জিয়া), দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে এখন কারাগারে। আরেকজন যাকে (তারেক রহমান) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা হলো, সে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে এখন দেশান্তরে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিতর্কিত বক্তব্য সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এক নেতা (রাশেদ খান মেনন) হয় তো কিছু কথা বলেছেন। কারণ তার মনে তো একটা দুঃখ হতেই পারে। তিনি জেনে হোক, না জেনে হোক, তাকে এক ক্লাবের চেয়ারম্যান করা হয়েছে এলাকার এমপি হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই কিছু তথ্য এসেছে। যখন কিছু তথ্য এসেছে, তখন তিনি কিছু কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, তিনি (রাশেদ খান মেনন) হয়তো ভুলে গেছেন, তিনিও সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে এসেছেন। নির্বাচনের ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে তার নির্বাচিত হওয়াটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। কাজেই সেটা তিনি তখন বুঝে বলেছেন, নাকি না বুঝে বলেছেন, সেটা আমি জানি না। আমি ১৪ দলকে সমস্যার সমাধান করতে বলেছিলাম। ১৪ দল তার ব্যাখ্যায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এ ইস্যুটি তো সেখানেই শেষ হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, গত নির্বাচনে জনগণ যদি আমাদের ভোটই না দিত, আর জনসমর্থন যদি আমাদের পক্ষে না থাকত, তাহলে তারা (বিএনপি) আন্দোলন গড়ে তুলতে পারল না কেন? গত নির্বাচনে এদেশের সব ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি সব সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রত্যেকে যেভাবে আমাদের সমর্থন দিয়েছে, এটা বাংলাদেশের জন্য একটা ‘অভূতপূর্ব ঘটনা’। তিনি বলেন, ক্যাসিনো কাণ্ডে ক্রিকেট বোর্ড জড়িত এটা ঠিক না। এটা বোর্ডের কিছু না। ক্যাসিনোতে যিনি ছিলেন, তিনি ধরা পড়েছেন। তিনি বলেন, আমরা তো অভিযান চালাচ্ছি। কে কখন কীভাবে ধরা পড়বে, বলা যায় না। আমরা কিন্তু ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের ধরেছি। তাদের কেউ বহাল তবিয়তে আছে, সেটাও ঠিক না। এখন আপনারা খুঁজে দেখেন, কোথায় কী পাওয়া যাচ্ছে। তবে কারও যদি জুয়া খেলার আকাঙ্ক্ষা থাকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছি—একটি চর বরাদ্দ দিন। সেখানে খেলুক, ট্যাক্স বসান। একটা নীতিমালা করুন, অন্তত ট্যাক্সটা তো পাওয়া যাবে।

দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এমন ১০০ জনের নাম আপনি দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনকে। এ রকম আর কত জনের তালিকা আপনার হাতে আছে—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কত জনের তালিকা আছে, সেটা কেন আমি এখন বলব? তবে এতটুকু বলতে পারি—কোনো এক পত্রিকার সম্পাদক, কোনো এক ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে ফোন করে বলেছে—কিছু টাকা চায়, সেটা যদি না দেওয়া হয় তাহলে এমন লেখা লিখবে যে তার জীবনটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। সেটা আগে বের হোক তারপর জানবেন। এটার রেকর্ড আছে। আইসিসি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেটার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিসিবি বলেছে তারা সাকিবের পাশে থাকবে। এ বিষয়ে আমাদের আসলে বেশি কিছু করার নেই।  তবু আমরা এটুকু বলব যে আমাদের  দেশের একটা ছেলে, সারা বিশ্বে ক্রিকেটে তার একটা আলাদা অবস্থান আছে। ভুল সে করেছে এটা ঠিক। সে এটা বুঝতেও পেরেছে।  ক্রিকেটারদের হঠাত্ করে আন্দোলন প্রসঙ্গে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ক্রিকেটারদের কোনো দাবি-দাওয়া থাকলে তা বিসিবিকে তারা জানাতে পারতো। কথাবার্তা নেই, হঠাত্ করে ধর্মঘট ডাকা জীবনে শুনিনি। তবে সেটা এখন মিটমাট হয়ে গেছে। কেননা আমরা যেভাবে আমাদের ক্রিকেটারদের সমর্থন দিই, পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে এমন সমর্থন দেয়। আমাদের ক্রিকেটাররা খেলছেও ভালো।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মূল মঞ্চে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ছিলেন। এছাড়া মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ন্যাম সম্মেলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফোরামে

বাংলাদেশের অবস্থান জোরদার হয়েছে

সামগ্রিক উন্নয়ন ও এসডিজি বাস্তবায়নে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জনগণের বহুপাক্ষিক ফোরাম ন্যামের ভূমিকা অনস্বীকার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এতে অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে জোরদার করেছে। তিনি বলেন, ন্যাম-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদান, পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণে আমাদের অঙ্গীকার, ফিলিস্তিনি জনগণসহ বিশ্বব্যাপী শোষিত মানুষের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ন্যামের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের একযোগে কাজ করার বিষয়গুলো বিশ্ববাসীকে অবহিত করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের পাশাপাশি ন্যাম-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।