হ্যাকিং একটি মারাত্মক সমস্যা

সাইফুল ইসলাম হাফিজ

বর্তমানে বিনোদন এবং অবসর সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম হলো সোস্যাল মিডিয়া। প্রায় সব বয়সের মানুষই এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে যুক্ত আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে। বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্যমতে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ২০ লাখ। ফেসবুক ব্যবহারকারী আছে প্রায় ৩ কোটি। এর পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে। তরুণ-তরুণীরা এই অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বেশি ব্যবহার করে থাকে। চিত্তাকর্ষক চিত্তবিনোদনের সন্ধানে ফেসবুকের গভীরতা মাপতে মাপতে (নিউজফিড দেখা) দিন-রাত পার করে দেয়। তারা বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে। কিন্তু বর্তমানে এই বিনোদনের মাধ্যমগুলো পরিণত হয়েছে ভয়ের এবং চিন্তার। ব্যবহারকারীদের মনে এই ভয়টা তৈরি করেছে ‘হ্যাকিং’ পদ্ধতি। এই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রবেশকালে সবারই নিজের নাম ও ঠিকানা দিতে হয়। যার ফলে সবার একটা স্বতন্ত্র আইডি (আইডেন্টিটি) তৈরি হয়। কিছু অসাধু লোক কাউকে ফাঁসানোর জন্য বৈধ অনুমতি ছাড়া অন্যের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে তার আইডি হ্যাকড করে ঠিক একই নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক কথা, রাষ্ট্র বিরোধী, উসকানিমূলক কথা ছড়ায়। আর এই তথ্যগুলো মুহূর্তেই অনলাইন দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। যার ফলে ঘটে নাসিরনগর ও ভোলায় ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতি ঘটনার মতো সহিংসতা, মারামারিসহ নানান দুর্ঘটনা। ঝরে যায় বহু তাজা, নিরীহ প্রাণ। নষ্ট হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এর জন্য ফেঁসে যায় অনেক নিরীহ, নিরপরাধ প্রাণ। বিনা অপরাধে দিনের পর দিন জেল খাটতে হয়। আর দুষ্কৃতকারীরা থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। আবার প্রতিশোধ নিতেও অনেক তরুণ-তরুণীর আইডি হ্যাকড করে অশ্লীল ছবি, ভিডিও প্রকাশ করা হয়; মেসেঞ্জারের ব্যক্তিগত কথোপকথনও ফাঁস করে দেওয়া হয়। যার দরুন ব্যবহারকারী ভীষণ লজ্জায় পড়ে। বন্ধুদের কাছে মুখ দেখাতে পারে না। খুব কাছের মানুষের কাছ থেকেও শুনতে হয় বিদ্রূপাত্মক উক্তি। এই কাজ যে সে করেনি কিংবা তিনি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে এই কথাটা কাউকে বোঝানো তার পক্ষে খুবই দুষ্কর হয়ে পড়ে। যেখানে নিমিষেই সহস্রাধিক মানুষ দেখে ফেলে সেখানে আর কতজনকে বোঝান সম্ভব? এই দুর্বিষহ মানসিক চাপ আর সহ্য করতে না পেরে অনেকে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। অনেক হ্যাকার ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণও দাবি করে নানা হুমকিও দিয়ে থাকে। আইডি ফেরত নিতে তাদের এই অযৌক্তিক, অবৈধ দাবি পূরণ করতে হয়। এই রকম জঘন্য কাজ হররোজ বেড়েই চলছে। ফলে এই মাধ্যমগুলো ব্যবহারকারীদেরও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। অবশ্য হ্যাকিংয়ের ভালো দিকও (হোয়াইট হাট হ্যাকিং) আছে। কিন্তু আমাদের সামনে হ্যাকিংয়ের নেতিবাচক, ক্ষতিকর দিকগুলো (ব্লাক হাট হ্যাকিং) বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, ভালো কাজের পরিবর্তে আমাদের সামনে এর মন্দ দিকটা উপস্থাপন করা হয়। এই আধুনিক যুগে মানুষ যেমন বেশি অনলাইনকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে তেমন অনলাইন দুর্বৃত্তায়নও বাড়ছে। এই (ব্লাক হাট) হ্যাকিং শুধু ফেসবুকের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না প্রায় সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেই আছে। ইলেক্ট্রনিক মেইল বা ইমেইলেও এটি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। যার জন্য ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টসিয়াল নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাও ঘটেছে এই হ্যাকিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই হ্যাকিং রোধ করার জন্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষ ঢের নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং দেশে সাইবার ক্রাইম আইন থাকলেও একে থামানোই যাচ্ছে না। তাই এর থেকে বাঁচতে হলে যারা এই মাধ্যমগুলোয় সক্রিয় আছেন তাদের সকলের সজাগ হয়ে অতি সতর্কতার সহিত এই ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনকে হালনাগাদ করার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষেরও আরো নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। আমরা আর নাসিরনগর কিংবা বোরহানউদ্দিনের মতো ভয়াবহ ঘটনা দেখতে চাই না। চাই না অকালে ঝরে পড়ুক আর কোনো তাজাপ্রাণ। অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাক স্বপ্নময়ী জীবন। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এগিয়ে যাক সম্প্রীতির বাংলাদেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়