কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিম দিকে নরসুন্দা নদীর তীরে দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদটি অবস্থিত। পাগলা মসজিদের নাম-ডাক জেলা শহর ছাড়িয়ে এখন সারা দেশে বিস্তৃত হয়েছে। পাগলা মসজিদের সুউচ্চ মিনারটি অনেক দূর থেকে দেখা যায়। প্রতিদিন হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ পাগলা মসজিদ দেখতে ও নামাজ পড়তে আসেন। বেশির ভাগ মানুষই আসেন মানত ও দান-খয়রাত করতে। তাদের বিশ্বাস, শুদ্ধ মনে এখানে এসে কিছু চাইলে সৃষ্টিকর্তা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করে দেন। দানবাক্সে নগদ অর্থ ছাড়াও সোনাদানা, রুপা-হীরা ইত্যাদি জমা হয়। তাছাড়া প্রতিদিনিই গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ডিম, দুধ থেকে শুরু করে উন্নয়নকাজের জন্য সিমেন্টের বস্তা, নারিকেল, মোমবাতি, কোরআন শরিফ এমনকি চুন-বাতাসা, পান-সুপারিও জমা হয়। দৈনন্দিন প্রাপ্ত এসব জিনিস প্রতিদিন বিকালেই নিলাম ডাকের মাধ্যমে বিক্রি হয় এবং পরদিন প্রাপ্ত টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়। এসব জিনিসপত্র বিক্রি করে প্রতিদিন দৈনিক গড়ে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় হয়। শুধু মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনই নয়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরও প্রচুর লোকজন এখানে আসেন, মানত ও দানবাক্সে দান করে যান। প্রতিদিন গড়ে সহস্রাধিক ধর্মপ্রাণ লোক এখানে আসেন এবং শুক্রবার এর সংখ্যা ৮-১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
ধারণা করা হচ্ছে, পাগলা মসজিদটি দুই শতাধিক বছরের পুরোনো হবে। তবে এটি নির্মাণের সঠিক কোনো ইতিহাস জানা যায়নি। মসজিদটিকে ঘিরে অনেক জনশ্রুতি রয়েছে। একটি জনশ্রুতি এরূপ :একসময় নরসুন্দা নদী প্রবল খরস্রোতা ছিল। একদিন দেখা গেল মাদুরের ওপর বসা এক সাধক পুরুষ স্রোতে ভাসতে ভাসতে এখানে এসে থেমে যান এবং পরে তার চারপাশে চরের মতো পড়ে যায়। স্থানীয় জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে এসে এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে বিস্মিত হন। চারদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে লোকজন ‘পাগলা সাধক’কে দেখতে আসে এবং তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে। পরে ভক্ত-শিষ্যদের বদৌলতে সাধকের জন্য একটি হুজরাখানা তৈরি করা হয়। এই সাধকের মৃত্যুর পর তার হুজরাখানার পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীকালে এই হুজরাখানার স্থানেই একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। উক্ত মসজিদই পরবর্তীকালে পাগলা সাধকের স্মৃতি হিসেবে ‘পাগলা মসজিদ’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। অপর জনশ্রুতি হলো, পাগলা মসজিদ নির্মাণে হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান হয়বত খানের অধস্তন পুরুষ জিলকদর খানের ভূমিকা ছিল।
পাগলা মসজিদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা মো. শওকতউদ্দিন ভুঁইয়া জানান, দান গ্রহণের জন্য মসজিদের ভেতরে আটটি দানবাক্স রয়েছে। এসব দানবাক্সে প্রতিদিন লাখ টাকার ওপর জমা হয়। তাছাড়া বিদেশি মুদ্রাসহ স্বর্ণালংকারও জমা পড়ে। সাধারণত তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পরপর এসব দানবাক্স খোলা হয়। তিন মাস ১৩ দিন পর গত ২৬ অক্টোবর দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৪ হাজার ৫৯৮ টাকা। এটিই এযাবত্কাল প্রাপ্ত সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ। তাছাড়া গত ১৩ জুলাই দানবাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১ কোটি ১৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫০ টাকা। মসজিদটির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কাজ চলমান আছে বলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান।