সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

বেলুন দেখতে এসে প্রাণ গেল ছয় শিশুর

বীভত্স। মর্মান্তিক। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। কারো চেহারা ঝলসে গেছে। ছোপ ছোপ কালচে তাজা রক্ত রাস্তায় গড়াচ্ছে। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি ১০ থেকে ১২টি শিশু মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। সেকেন্ডের মধ্যে অসহায় বাবা নুরু ইসলাম দেখেন, তার ১১ বছরের শিশু রুবেলের ছিন্নভিন্ন দেহ একটু দূরে পড়ে আছে। রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় শিয়ালবাড়ী বস্তির সামনে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল বুধবার বিকাল ৪টার দিকে বেলুন ফোলানোর হাইড্রোজেন গ্যাস    রি-অ্যাক্টর বিস্ফোরিত হলে ভয়ংকর এই ঘটনা ঘটে। একটি রিকশাভ্যানে করে গ্যাস বেলুন বিক্রি করা হচ্ছিল। শখের বেলুন কিনতে রিকশাভ্যানটিকে ঘিরে ধরেছিল প্রায় ২০টি শিশু। বেলুনওয়ালার চারদিক ঘিরে শিশুদের আনন্দ, হইহুল্লোড়। গ্যাস দিয়ে ফোলানো রঙিন বেলুন উড়ে যাচ্ছিল আর বেলুনটি সুতা দিয়ে শিশুর হাতে বাঁধা ছিল। ভ্যানটিতে হঠাত্ প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ। মুহূর্তে আনন্দ-হুল্লোড় শোক, আতঙ্ক, চিত্কারে পরিণত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে আছে রঙিন বেলুন আর শিশুদের ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহ। বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড হয়ে যায় পাঁচ শিশুর পরিবারের বাবা-মায়ের স্বপ্ন। এ ঘটনায় আরো ১৭ শিশুসহ ২০ জন আহত হয়। নিহতরা হলো রুবেল (১১), রমজান (৮), শাহীন (৯), নুপুর (৯) ও ফারজানা (৬)। তবে বেলুনবিক্রেতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন জুয়েল (৩০) ও সোহেল (২৫) নিজেদের রিকশাচালক বলে দাবি করেছেন।

শিশুদের দেহ ছিন্নভিন্ন

বিস্ফোরণের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন রূপনগর আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের বাসিন্দা সোহাগ নামের এক তরুণ। তিনি বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাত্ অনেক জোরে একটা শব্দ শুনে জেগে উঠি। দেখি আমার ঘর কাঁপছে। পরে বাইরে বের হয়ে দেখি বাচ্চাদের ছিন্নভিন্ন দেহের অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। কেউ মৃত, কেউ জীবিত। রাস্তায় রক্ত আর মাংস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। চারদিকে ধোঁয়া আর ধোঁয়া। আমি নিজেই তিনজনকে উদ্ধার করে রূপনগর সুরক্ষা হাসপাতালে নিয়ে যাই। যারা মারা গেছে, তারা সবাই ১১ নম্বর রোডের বস্তির শিশু।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের লাশঘরের সামনে চিত্কার করে কাঁদছিলেন নূর ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি একজন রিকশাচালক। তার চোখের সামনে ১১ বছরের শিশু রুবেল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘ওরে রিকশাভ্যানের কাছে রাইখা সামনে আগাইয়া গেছি। ও বেলুন কিনবার চাইছিল। একটু আগায়া যাইতেই প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ। কালো ধোঁয়ার মধ্যে দেখি ১০-১২টা বাচ্চা ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়ে।’ তিনি বলেন, ভোলায় তার বাড়ি। ১১ নম্বর রোডের শেষ মাথায় টিনশেড বস্তিতে তিনি থাকেন। রুবেলকে কয়েক দিন আগে ভোলা থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিল। ইচ্ছা ছিল স্কুলে ভর্তি করার। কিন্তু তার এই স্বপ্ন পূরণ হলো না। রূপনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক কুমার দাস বলেন, গ্যাস বেলুন বিক্রির রিকশাভ্যান দেখে শিশুরা সেখানে ছুটে যায়। নিহত শিশুদের লাশ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার পরপর জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে ফোন পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট উদ্ধারকাজ চালায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাঁচ শিশুর লাশ উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠান। ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে পাঁচ-ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে চার জনকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেহা, অর্ণব, জনি, মোরসালিনা, মীম, সিয়াম, মোস্তাকিন, উজুফা, তানিয়া, জামিলা, বায়েজিদ, সোহেল, রাকিব এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো এক শিশুকে ভর্তি করা হয়। এছাড়া জান্নাত ও জুয়েল নামে এক নারী ও যুবককে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে গৃহকর্মী জান্নাতের এক হাত উড়ে গেছে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, চারজনকে মৃত অবস্থায় এই হাসপাতালে আনা হয়। আহতদের মধ্যে চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। যে দুজন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে, তারা বিপদমুক্ত। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। তিনি বলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয়েছে। আহত ও নিহতদের পাশে দাঁড়াতে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন।

অবৈধ হাইড্রোজেন গ্যাস রি-অ্যাক্টর

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামছুল আলম গতকাল বলেন, এটা হাইড্রোজেন গ্যাস রি-অ্যাক্টরের বিস্ফোরণ। এভাবে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরির কোনো অনুমোদন নেই। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বহুবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।