বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ প্রবীণ। ২০৫০ সালে প্রায় ৪ কোটি এবং ২০৬১ সালে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। ২০৫০ সালের দিকে এদেশের ২০ শতাংশ নাগরিক হবেন প্রবীণ এবং শিশু জনসংখ্যা হবে ১৯ শতাংশ। প্রবীণ বা বৃদ্ধ বয়স মানব জীবনের শেষ ধাপ। মানুষ জীবনের শিশু কৈশোর ও যৌবনকাল পার করে বার্ধক্যে আসে। অর্থাত্ তারা প্রবীণে পরিণত হয়। বৃদ্ধ বা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যার দিক দিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। ৯৬টি দেশের তালিকার সবচেয়ে নিচে আছে আফগানিস্তান। ভারতের অবস্থা ৭১, আর বাংলাদেশের ৬৭।
প্রবীণ মানেই সেকেলে, অথর্ব্য, অক্ষম, সংকীর্ণতা, অসুস্থতা এবং সংসারের বোঝা নয়। তারাই আজকের এই সুন্দর সমাজ গড়ার সুনিপুণ কারিগর। অথচ বয়স বৈষম্য প্রবীণদের অন্যতম একটি নেতিবাচক অবমাননাকর, অগণতান্ত্রিক, অমানবিক এবং অনৈতিক বিষয়। সমাজের কোনো ক্ষেত্রেই তারা সমাদৃত হন না। বরং চরম অবহেলা, অবজ্ঞা, সমালোচনা আর উদাসিনতা তাদের মনকে খুবই আহত করে। এতে শুধু প্রবীণরাই বিছিন্ন হচ্ছেন তা নয়। আমরাও বঞ্চিত হচ্ছি তাদের অভিজ্ঞতা ও সম্পৃক্ততার সুফল থেকে, যা মোটেই কাম্য নয়।
আধুনিক সমাজে অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণরা শুধুই অবহেলিত এবং বঞ্চিত। একাকী বাড়িতে বা বৃদ্ধাশ্রমে তারা যান, কেউ বা নিতান্ত বাধ্য হয়েই এই ভাগ্যকে বরণ করে নেন। পুত্র, কন্যা, আপনজন ও আত্মীয়স্বজনদের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তারা মানসিকভাবে মর্মাহত হয়ে অত্যন্ত কষ্ট ভোগ করেন। একাকিত্ব যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। অসহায় হয়ে তারা অসুস্থতার মধ্যে দিন যাপন করেন। ইসলাম ধর্মে প্রবীণদের সেবা করা মানুষের অন্যতম ফরজ কাজ করে দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সিস বেকেনের মতে, ‘নৈতিক জগতে নবীনদের প্রাধান্য আর প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে প্রবীণদের। পল রবসনের মতে, ‘সবাইকে একদিন বৃদ্ধ হতে হবে। যারা-যুবক, যুবতি তাদের এ কথাটি মনে রাখা উচিত। বৃদ্ধদের সম্মান করতে না পারো, অসম্মান করো না।
সর্বশ্রেষ্ঠ মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। তিনি ১৬১৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরা নাম হাফেজ আবু জাফর মোহাম্মদ মহিউদ্দীন আওরঙ্গজেব। ১৭০৭ খৃিষ্টাব্দে ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুকালে তিনি তার পুত্র কামবকসকে এই বলে চিঠি লিখেছিলেন,—‘আজ আমি বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ, শরীর একান্ত দুর্বল। যখন জন্মেছিলাম তখন কত লোক ও ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যই না ছিল। জীবনের উজ্জ্বল দিনগুলো চলে গিয়েছে। আছে শুধু অস্থি, চর্ম, আর কঙ্কাল। আজ আমি একা, অসহায়, অস্থির ও বিমূঢ়। তার এই চিঠিতেও বোঝা যায় যে, সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রবীণ বয়সে কত অসহায় এবং একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন।
প্রবীণ বা বৃদ্ধদের প্রতি দায়িত্ব শুধু পরিবারেই নয় বরং সমাজের সবারই উচিত প্রবীণদের মান্য করা গুরুত্ব দেওয়া, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্মানজনক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করা। প্রবীণরা যেন কারো আচরণে কখনো মনে কষ্ট না পায়, সে ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল করা। সমাজে তাদেরও যে প্রয়োজন আছে একথা তারা যেন অনুধাবন করতে পারে।
আসলেও তাই, বাস্তব জীবনে প্রবীণ ব্যক্তি না থাকলে পারিবারিক জীবনে অসম্পূর্ণতা থেকেই যায়। বিভিন্ন হাদিসে প্রবীণ বা বৃদ্ধদের মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ছোটোদের স্নেহ করে না এবং প্রবীণ ও বয়স্কদের সম্মান করে না, তাদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন নয়, সে ব্যক্তি আমার উম্মত নয়—(তিরমিযী, আস সুনান ৪/৩২১)।
পুলিশ ও র্যাবে দীর্ঘদিন চাকুরি করাকালীন সময়ে অনেক জায়গায় দেখেছি, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে প্রবীণরা আজ অরক্ষিত, অসহায়, অভাবী, বিচ্ছিন্ন এবং বয়স বৈষম্যসহ নানামুখী বৈষম্য এবং দুর্ব্যবহারে জর্জরিত। তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। এমন কি কোথাও কোথাও তারা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। অথচ তারা দেশের সিনিয়র সিটিজেন। দুর্বল স্বাস্থ্য আর উপার্জনহীন একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে পদে পদে স্বজন, সমাজ, পরিবার, কর্মস্থলসহ সকলের কাছে অবহেলা, উপেক্ষা, দুর্ব্যবহার এবং নানা ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্যাংক, ডাকঘর, পেনশান তোলার কেন্দ্র, চিত্তবিনোদনস্থলসহ সকল গণসেবা কেন্দ্রে তিনি আর মোটেই সমাদৃত হন না। পেশাজীবীসহ সকলের কাছেই তিনি যেন অনাহুত, অসমাদৃত এবং উটকো ঝামেলা বিশেষ। তাকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যেতে চায়। কারণ তার দোষ তিনি একজন বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ।
আমরা ভুলে যাই যে, বেঁচে থাকলে সকলকেই একদিন প্রবীণ হতে হবে। বিশ্ব প্রবীণ দিবসে আমাদের শপথ হোক, আমরা সব সময় প্রবীণদের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে মান্য করে তাদেরকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করব। যে কোনো বিষয়ে গুরুজন হিসেবে তাদের মতামতকেই প্রাধান্য দিব। তাদের শারীরিক এবং মানসিক সমস্যাসহ সব ধরনের দুঃখ, কষ্ট, অসুবিধা দূরীকরণের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব। কখনোই তাদের সাহচর্য ত্যাগ করব না। সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে প্রবীণদের মর্যাদা সবার ওপরে। একটা কথা আবশ্যই মনে রাখা উচিত, আজ যারা নবীন, আগামীতে তারাই প্রবীণ। বেঁচে থাকলে সকলকেই একদিন প্রবীণ হতে হবে। প্রবীণদের প্রতি নবীনদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা মার্জিত এবং শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে প্রবীণদের মূল্যায়ন করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের অভিজ্ঞতাপূর্ণ মতামত, উপদেশ, পরামর্শ, বুদ্ধি ইত্যাদি গ্রহণ করতে হবে। তারা যেন বুঝাতে পারেন পারিবারিক এমনকি সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের প্রয়োজন এবং গুরুত্ব রয়েছে। আর তবেই প্রবীণরা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের জীবনকে আনন্দ চিত্তে সার্থক ভাববেন। ফলে প্রবীণদের জীবনটা হবে সফল, নচেত্ নয়।
n লেখক : সাবেক পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তা