পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি: লাভ-ক্ষতির সমীকরণ

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ২১:৫৫

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ (যা শান্তি চুক্তি নামে কথিত)। চুক্তির প্রথম পক্ষ তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, এর মাধ্যমে পাহাড়ে দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার অবসান ঘটবে এবং জাতীয় অখণ্ডতা রক্ষা করে অবহেলিত অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের সুবাতাস বইবে।

চুক্তির অপর পক্ষ জেএসএস এবং তাদের সশস্ত্র উইং ‘শান্তিবাহিনী’র অঙ্গীকার ছিল—তারা সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর আজ প্রশ্ন উঠেছে—একক সার্বভৌম রাষ্ট্রে এই চুক্তির লাভ-ক্ষতির সমীকরণে কার অংশে কী জমা হলো? বাস্তবতার চুলচেরা বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, শান্তি চুক্তি পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি আনতে তো পারেইনি, উল্টো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক কাঠামো এবং পাহাড়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকারকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামোর সাংবিধানিক সংকট
বাংলাদেশ সংবিধানের মূল ভিত্তি হলো এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু শান্তি চুক্তির আলোকে গঠিত ‘পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ’ এবং তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদকে যে বিশেষ আইনি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক (সূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১০ নভেম্বর ২০২৫, ‘পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ: একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো!’)। এই বিশেষ কাঠামো মূলত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রায়-স্বায়ত্তশাসিত দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অখণ্ডতার জন্য এক বড় হুমকি। সংবিধান ও চুক্তির মধ্যকার সুনির্দিষ্ট দালিলিক সংঘাতসমূহ নিম্নরূপ:

১ নং অনুচ্ছেদ (এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র বনাম বিশেষ এলাকা): সংবিধানের ১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে কোনো আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের সুযোগ নেই। অথচ চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ১ নং ধারা অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানকে ‘বিশেষ অঞ্চল’ ঘোষণা করে আঞ্চলিক পরিষদকে একচেটিয়া কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।
৬৫ নং অনুচ্ছেদ (আইন প্রণয়নের একক ক্ষমতা): সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের একমাত্র কর্তৃপক্ষ ‘জাতীয় সংসদ’। কিন্তু পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ২২ ধারা এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য যেকোনো নতুন আইন, বিধি বা প্রশাসনিক নির্দেশ জারির আগে আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের "পূর্ব সম্মতি" নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ফলে জাতীয় সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা স্থানীয় পরিষদের ভেটো (Veto)-র কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

২৭ ও ২৮ নং অনুচ্ছেদ (সমঅধিকারের লঙ্ঘন): সংবিধানে ধর্ম, গোষ্ঠী বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্যহীনতার কথা বলা হলেও, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সংশোধনী অনুযায়ী জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি কেবল ‘উপজাতি’দের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এটি পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক (৫১%) বাঙালি জনগোষ্ঠীকে মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে স্পষ্ট সাংবিধানিক বৈষম্য তৈরি করেছে।

আইন-শৃঙ্খলা ও ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতা: চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ২৪ এবং ২৬ নং ধারা অনুযায়ী, স্থানীয় উপজাতি পুলিশ নিয়োগের ক্ষমতা এবং জেলা পরিষদের অনুমতি ছাড়া পাহাড়ের ভূমি হস্তান্তর বা লিজ না দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় প্রশাসন চাইলেও পাহাড়ের ভূমি বা আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না, যা প্রশাসনিক পঙ্গুত্ব তৈরি করে।


‘আদিবাসী’ বিতর্ক! তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি বনাম ঐতিহাসিক দলিল
চুক্তি-পরবর্তী সময়ে উপজাতি আঞ্চলিক দলগুলো এবং তাদের সমর্থক সুশীল সমাজের একটি অংশ উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জোরালো তৎপরতা শুরু করে। তবে এই দাবি ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং একটি গভীর তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি মাত্র (সূত্র: দৈনিক যায়যায়দিন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী বিতর্ক: তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা’)।

ইতিহাস এবং নৃ-তাত্ত্বিক তথ্যাদি প্রমাণ করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান উপজাতি গোষ্ঠীগুলো এই অঞ্চলের ভূমিপুত্র বা আদি বাসিন্দা নয়; বরং তারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী মিয়ানমার (তৎকালীন আরাকান ও পেগু) এবং ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম অঞ্চল থেকে অভিবাসিত হয়ে এই ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়েছে।

ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইন তাঁর “The Hill Tracks of Chittagong and the Dwellers Thereon” (1869) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখেছেন, চাকমারা মূলত আরাকান থেকে এবং মারমারা পেগু থেকে ১৭ ও ১৮ শতকের দিকে অভিবাসিত হয়ে এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে।

ড. অমেসদ্ধা দেখিয়েছেন, ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা বোদাপায়া কর্তৃক আরাকান বিজয়ের পর অত্যাচার থেকে বাঁচতে হাজার হাজার চাকমা শরণার্থী হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে।

স্যার উইলিয়াম হান্টার তাঁর “A Statistical Account of Bengal” (1876) গ্রন্থে এদের 'Recent Immigrants' বা 'সাম্প্রতিক অভিবাসী' হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
সবচেয়ে বড় দালিলিক প্রমাণ স্বয়ং ১৯৯৭ সালের মূল চুক্তি। এই চুক্তির ভূমিকা এবং ‘ক’ ও ‘খ’ খণ্ডের বিভিন্ন ধারাসহ সমগ্র দলিলের ৭২টি ধারার মধ্যে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ (Tribal) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে সন্তু লারমা নিজে স্বাক্ষর করেছেন। অথচ এখন মূল চুক্তি লঙ্ঘন করে তারা নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করছেন এবং সন্তু লারমা নিজে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী পরিষদ’-এর সভাপতির পদ অলংকৃত করছেন। আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর অপব্যাখ্যা দিয়ে উপজাতিদের জোরপূর্বক 'আদিবাসী' বানানোর চেষ্টা মূলত পাহাড়ের ওপর আন্তর্জাতিক মোড়লদের হস্তক্ষেপের পথ সুগম করার এবং একটি স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ বা বাফার স্টেট গঠনের সুদূরপ্রসারী কৌশল (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী দাবি ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি’)। সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ২৩ক) তাদের সঠিকভাবে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ।


সেনা প্রত্যাহার ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি
শান্তি চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে একটি সম্পূর্ণ ব্রিগেড এবং চারটি ফিল্ড রেজিমেন্টসহ ২৪০টিরও বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো ‘পাহাড় থেকে সেনা হটাও’ আন্দোলনের নামে আন্তর্জাতিক মহলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, এই সেনা প্রত্যাহারের নেপথ্যে রয়েছে এক ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডা (সূত্র: দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ, ‘পাহাড় থেকে সেনা হটাও আন্দোলনের নেপথ্যে’)।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ যেখানে ক্যাম্প গুটিয়ে নিচ্ছে, সেখানে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার কৌশলগত কারণে তাদের সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি ও অবকাঠামো বহুগুণ বৃদ্ধি করছে (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ‘সীমান্তে সেনা বাড়াচ্ছে ভারত-মিয়ানমার, বাংলাদেশ করছে প্রত্যাহার! কার স্বার্থে, কী স্বার্থে?’)। ভারতের বিএসএফ মিজোরাম ও ত্রিপুরা সীমান্তে ব্যাটালিয়ন বৃদ্ধি করে কাঁটাতারের বেড়া ও থার্মাল ইমেজিং স্থাপন করেছে; অন্যদিকে মিয়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মি (এএ) ভারী অস্ত্রসহ বিপুল সেনা মোতায়েন রেখেছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার ৫৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত আজ প্রায় অরক্ষিত ট্রানজিট জোনে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আরকান আর্মির মাদক নীতি ও ইয়াবা-আইসের চোরাচালান এবং অবৈধ মারণাস্ত্র অবাধে দেশে প্রবেশ করছে। অতি সম্প্রতি বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক ডাকাতি এবং সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘কেএনএফ’ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট)-এর উত্থান এবং তাদের পৃথক ‘কুকি-চিন রাজ্য’ গঠনের দালিলিক ইশতেহারই প্রমাণ করে যে, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে পাহাড়ে কীরূপ সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি হয়েছে।


চুক্তির শর্ত ভঙ্গ ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিটি ছিল একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা। কিন্তু চুক্তির অপর পক্ষ জেএসএস তাদের শর্ত কতটুকু পালন করলো, তা সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে গেছে। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১২ ও ১৩ নং ধারার সুনির্দিষ্ট শর্তানুযায়ী, ৪৫ দিনের মধ্যে জেএসএস-কে তাদের সমস্ত সশস্ত্র সদস্যের তালিকা এবং সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ সমর্পণ করার কথা ছিল। কিন্তু জেএসএস কৌশলে তাদের সবচেয়ে চৌকস যোদ্ধাদের এবং অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রগুলো জমা না দিয়ে কেবল কিছু পুরনো ও ভাঙাচোরা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নাটক সাজায়। স্বয়ং সন্তু লারমা ২০১১ সালের ২৫ নভেম্বর একটি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সকল অস্ত্র জমা দেওয়ার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন, যা রাষ্ট্র ও জাতির সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
বর্তমানে জেএসএস ভেঙে জেএসএস (মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (মূল), ইউপিডিএফ (সংস্কার), এমএলপি, এমএনপি এবং কেএনএফ-এর মতো একাধিক সশস্ত্র দল-উপদল তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ে প্রায় ৩ হাজার সশস্ত্র এবং ১০ হাজার সেমি-আর্মডসহ মোট ১৩ হাজার সন্ত্রাসী সক্রিয়ভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাহাড়ে এক সুসংহত চাঁদাবাজির অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, যা স্থানীয়ভাবে মধ্যযুগীয় ‘জিজিয়া কর’ নামে পরিচিত (সূত্র: দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামেসর সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি’)। পাহাড়ি-বাঙালিনির্বিশেষে প্রত্যেক ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও কৃষককে জিম্মি করে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে এবং সেই অর্থ দিয়ে রকেট লাঞ্চার, গ্রেনেড ও হাউইটজারের মতো ভয়ঙ্কর যুদ্ধাস্ত্র সীমান্ত দিয়ে পাহাড়ে প্রবেশ করছে।

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, সন্তু লারমা ১৯৯৯ সাল থেকে টানা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং জাতীয় পতাকা সংবলিত গাড়ি ভোগ করছেন। অথচ তিনি বাংলাদেশের কোনো জাতীয় দিবস (যেমন স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস) পালন করেন না এবং দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) গ্রহণ করেননি বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।


উদ্বাস্তু বাঙালি ও গুচ্ছগ্রামের মানবিক ট্র্যাজেডি
এই ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি—স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠী। চুক্তিতে ভারত প্রত্যাগত উপজাতি শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট টাস্কফোর্স এবং বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধার কথা উল্লেখ থাকলেও, পাহাড়ে বসবাসরত লাখ লাখ অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বাঙালিদের পুনর্বাসনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে শান্তিবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যার মুখে বাঙালিদের নিরাপত্তা দিতে তৎকালীন সরকারের সময়ে তাদের ‘গুচ্ছগ্রাম’-এ নিয়ে আসা হয়। আজ চুক্তির তিন দশক পরেও প্রায় ৮১টি গুচ্ছগ্রামে ১ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি বাঙালি পরিবার অত্যন্ত মানবেতর ও বন্দি জীবনযাপন করছে, যারা আজ পর্যন্ত তাদের বৈধ মালিকানাধীন জমি ফেরত পায়নি (সূত্র: দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ, ‘পাহাড়ে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের কাজ কী?’)।

‘পাহাড়ে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্স’-এর প্রধান পদটি সবসময় উপজাতিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা বাঙালিদের ‘অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করতেই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তদুপরি, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ আইনটি বাঙালিদের জন্য এক জীবন্ত ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই কমিশনের মোট ৯ জন সদস্যের মধ্যে ৭ জনই স্থানীয় উপজাতি সম্প্রদায়ের। বাকি ২ জন সরকারের প্রতিনিধি (একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও অপরজন বিভাগীয় কমিশনার) রয়েছেন যার বাঙালিও হতে পারেন উপজাতীয়ও হতে পারেন। 

পাহাড়ের প্রায় ৫১% বাঙালি জনগোষ্ঠীর কোনো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এই কমিশনে রাখাই হয়নি। ফলে ভূমি কমিশন এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের একচেটিয়া উপজাতি-তোষণ নীতির কারণে হাজার হাজার বাঙালি পরিবার তাদের বৈধ কবুলিয়ত বা ডিসিআর থাকা সত্ত্বেও জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আজ ভূমিহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে (সূত্র: দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ, ‘পাহাড়ে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের কাজ কী?’)।


রাষ্ট্রীয় নীতি সংস্কার ও সুপারিশমালা
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো আসমানী কিতাব বা অপরিবর্তনীয় দলিল নয়। গত তিন দশকের বাস্তব অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই চুক্তি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারেনি, বরং কতিপয় আঞ্চলিক নেতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর গডফাদারদের আখের গোছানোর হাতিয়ার হয়েছে (সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ, ‘পার্বত্য চুক্তি পর্যালোচনা: সার্বভৌমত্ব ও সমঅধিকারের প্রশ্ন’)। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রে একক কোনো অঞ্চলের জন্য সংবিধানের পরিপন্থী কোনো কালো চুক্তি অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না। বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পেরে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সরকারি দল বিএনপি ও প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামি তাদের নির্বচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূনর্মূল্যায়নের অঙ্গিকার করেছেন। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা এবং পাহাড়ে সমঅধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় নীতি সংস্কার জরুরী। নিম্নে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও সুপারিশমালা দেয়া প্রস্তাব করা হল-

১. সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন ও চুক্তি পর্যালোচনা: জাতীয় সংসদের মাধ্যমে একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক পর্যালোচনা কমিটি গঠন করতে হবে, যা সংবিধানের ১, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৬৫ নং অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক ধারাগুলো চিহ্নিত করে তা বাতিল বা সংশোধন করবে।
২. ১৯০০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েল’ বাতিল: ব্রিটিশ আমলের বিভেদপন্থী ও ঔপনিবেশিক আইন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’ যা একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো টিকিয়ে রেখেছে, তা সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করে সমগ্র বাংলাদেশের মতো অভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজস্ব আইন পাহাড়ে কার্যকর করতে হবে।
৩. একপাক্ষিক সেনা প্রত্যাহার নীতি স্থগিত: ৫৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্তে নিরাপত্তার শূন্যতা পূরণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে পুনরায় তার স্ট্র্যাটেজিক ও কৌশলগত ক্যাম্পগুলোতে মোতায়েন করতে হবে এবং ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর আওতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৪. সর্বাত্মক যৌথ অভিযান ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার: জেএসএস, ইউপিডিএফ, এবং কেএনএফ ও এমএলপি-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজির অর্থনীতি ভেঙে দিতে এবং পাহাড় থেকে অবৈধ মারণাস্ত্র নির্মূল করতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা সর্বাত্মক ‘যৌথ অভিযান’ পরিচালনা করতে হবে।
৫. ভূমি কমিশন ও টাস্কফোর্স সংস্কার: পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের সাথে সংগতি রেখে ভূমি কমিশনে বাঙালি প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে একজন নিরপেক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে এবং আনুপাতিক হারে বাঙালি সদস্য অন্তর্ভূক্ত করে গুচ্ছগ্রামের ১ লাখ ২৮ হাজার বাঙালি পরিবারকে তাদের বৈধ জমি বুঝিয়ে দিয়ে পুনর্বাসন করতে হবে।
৬. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন: পাহাড়ের আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদগুলোকে কতিপয় মনোনীত নেতার আজীবন ক্ষমতার উৎস বানিয়ে না রেখে, পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের সমান ভোটাধিকার এ প্রার্থী হবার অধিকার নিশ্চিত করে অবিলম্বে সেখানে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিশেষে, বিগত তিন দশকের রূঢ় বাস্তবতা ও বস্তুনিষ্ঠ খতিয়ান স্পষ্ট করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির হিসাব-নিকাশে লাভের খাতাটি প্রায় শূন্য, অথচ ক্ষতির খাতাটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মানবিক অধিকারের দিক থেকে অত্যন্ত ভারী। শান্তি ও অখণ্ডতার আশায় রাষ্ট্র যে চুক্তিটি সম্পাদন করেছিল, তা আজ বুমেরাং হয়ে দেশের গলায় কাঁটার মতো বিঁধেছে। এই শান্তি চুক্তি পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি আনতে তো পারেইনি, বরং রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক কাঠামো এবং পাহাড়ের সিংহভাগ সাধারণ পাহাড়ি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থায়ী বাঙালি জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

পাহাড়ে প্রকৃত ও টেকসই শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রকে এখন কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তত্ত্বের মোহ থেকে বের হয়ে এসে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। সেখানে অনতিবিলম্বে একপাক্ষিক সেনা প্রত্যাহারের আত্মঘাতী নীতি পরিহার করে রাষ্ট্রীয় আইনের শাসন ও নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে এবং পাহাড়ের উপজাতি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য সংবিধানে বর্ণিত সমঅধিকার ও সমবণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে সমগ্র দেশের জন্য অভিন্ন শাসনব্যবস্থা চালুর মাধ্যমেই কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি কাটিয়ে একটি সুসংহত, বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও অখণ্ড বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।

ইত্তেফাক/এসএএস