বাঙালির নাকি বারো মাসে তেরো পার্বণ! এমন প্রবাদ এখন আক্ষরিক অর্থেই ক্লিশে! বারো মাসে তেরো কেন, একশো তিরিশ রকম উত্সব এখন দেখা যাচ্ছে এ বাংলায়! বস্তুত, সংখ্যার গণ্ডি ভেঙে নতুন নতুন উত্সবের সৃষ্টি হচ্ছে। এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ভোট-উত্সব। সারা দেশে এখন ব্যাপকভাবে ভোট-উত্সব শুরু হয়ে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া মহল্লায়-সবখানে চলছে সাজ সাজ রব। নির্বাচনী পোস্টার, হ্যান্ডবিল আর ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে জনপদ। ‘ভোট চাই ভোটারের, দোয়া চাই সকলের; নৌকা মার্কায় দিলে ভোট, শান্তি পাবে দেশের লোক’; ‘সারা বাংলার ধানের শীষে, জিয়া তুমি আছ মিশে’—এ রকম অনেক স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত। প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পরই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারযুদ্ধ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট কিংবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, উভয়পক্ষই সরব নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায়। কেউ প্রচারপত্র বিলি করে, কেউ মাইক বাজিয়ে, কেউ পোস্টার সাঁটিয়ে, কেউ সমাবেশ করে, কেউ আবার দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে শুরু করেছে নির্বাচনী প্রচার। রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিয়ে ইতোমধ্যে নির্বাচন-উত্সব জমিয়ে তুলেছে। প্রায় ১০ বছর পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটি ভোটের অপেক্ষায় জাতি। মহাজোট প্রার্থীদের কণ্ঠে বেশি শোনা যাচ্ছে দেশের উন্নয়ন ধরে রাখতে নৌকার বিকল্প নেই। আর বিএনপি ও তাদের শরিকরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল সরকার গঠন করে। সরকারে থাকার কিংবা সরকারে যাবার জন্য তাই সংসদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তাই পাঁচ বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। এই দিনটিতে নেতা বাছাই করা হয় ভোট-উত্সবের মাধ্যমে। ভোট গুরুদায়িত্বও বটে। কারণ দেশের অগ্রযাত্রা নির্ভর করবে এই ভোটের ওপর। নির্বাচনে উত্তেজনা ও উত্কণ্ঠা থাকে। এসব উড়িয়ে প্রতিটি নাগরিক তথা ভোটারের কাছে পাঁচ বছর পর ভোট দেয়ার উপলক্ষটিই বড় হয়ে ওঠে। এই ভোটকে কেন্দ্র করে অধিকার সচেতন বাঙালি একটা উত্সবের আমেজে মেতে ওঠে। ধনী-দরিদ্র, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন, ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সবার একটাই পরিচয়—সে ভোটার। এর মধ্যে কয়েকজন মাত্র প্রার্থী থাকেন।
প্রার্থীরাও ভোটার। এ সময় ভোটাররা কেমন জানি সবাই নিজেকে কেউকেটা ভাবতে শুরু করেন। অন্য সময় তারা জনপ্রতিনিধিদের কাছে উঁচু গলায় কিছু বলতে পারেন না। অনেক সময় তাদের দেখাও পাওয়া যায় না। কিন্তু ভোটের মৌসুমে তাদের ঠিকই সামনে পাওয়া যায়। এই সময়টাতেই ভোটারদের মূল্যায়ন করা হয়। জনপ্রতিনিধিরা ভোটারদের খুব কাছে আসেন কিংবা খুব কাছ থেকে তারা জনপ্রতিনিধিদের দেখেন, এটাও তাদের জন্য আনন্দের। ভোটের আগে তাই ভোটাররা নিজেদের খুবই সৌভাগ্যবান মনে করেন।
এই ভোট-উত্সবে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা হয় প্রার্থীদের। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোট দেয়ার আগ পর্যন্ত প্রার্থীদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সেইসঙ্গে নেতাকর্মী-সমর্থকদেরও নাওয়া-খাওয়ার হিসাব গরমিল হয়ে পড়ে। প্রার্থী ও প্রতীকের পক্ষে পোস্টারিং, মিছিল, মাইকিং, পথসভা, হাটসভা, শোভাযাত্রা দিনরাত সরগরম এলাহিকাণ্ডে ভোটারদের মন-জয় ও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিচিত্র সব প্রচারণা। ভোটারদের দ্বারে গিয়ে প্রার্থীদের ভোট প্রার্থনা চলে। ভোটারদের জন্য মন-ভোলানো আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি কিংবা সব সমস্যা সমাধানের প্রতিজ্ঞা নিয়ে প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করছেন।
কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী-সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়; যা বাড়িয়ে দেয় উত্তাপ। শুধু প্রার্থী-সমর্থকদের মাঝে নয়, নির্বাচনের এ উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে জনগণের মাঝেও। গ্রামগঞ্জে, পাড়ায় পাড়ায় ঝড় ওঠে চায়ের কাপে। কাকে ভোট দেবে তা নিয়ে পরিবারের মধ্যেও দেখা দেয় বিভক্তি। ভোট নিয়ে বাঙালির আগ্রহ, উদ্দীপনা, উত্তেজনা, প্রচারণা সবকিছুই রূপ নেয় উত্সবে। রেষারেষি সত্ত্বেও পাশাপাশি থেকেই চলে এ উত্সব। ভোটের মাঠে এখন চায়ের কাপে ঝড় নানা কারণে, দলীয় প্রার্থী নিয়ে নানা কথা-কুকথা তো ছড়াচ্ছেই। তাই চায়ের দোকানগুলোও খোলা থাকছে গভীর রাত অব্দি। কী করলে কী হবে, বা কাকে ভোট দিলে কে জিতবে তার পাশাপাশি উঠে আসছে নানা রঙ্গরসও। নির্বাচন এলে উত্সবপ্রিয় বাঙালি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সর্বত্রই একই আলোচনা। যারা রাজনীতি বোঝেন তারাও আলোচনা করেন, যারা তেমন বোঝেন না তারাও এটা নিয়ে পড়ে থাকেন। চলার পথে বাস, ট্রেন, লঞ্চ সবখানে আলোচনা আর গল্প-আড্ডার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে ভোট। রাজনীতি এদেশের মানুষকে কতটা স্পর্শ করে তা ভোট এলে টের পাওয়া যায়।
দেশজুড়ে বয়ে চলা ভোটের হাওয়ায় শীতের হাওয়াও এবার গরম হয়ে উঠেছে। সঙ্গে চলছে ভোটের চা। স্থানীয় হোক কি জাতীয়-নির্বাচন এলেই চায়ের দোকানদারদের পোয়াবারো অবস্থা। প্রার্থীর পক্ষ থেকে এসব দোকানে চলে ফ্রি চা খাওয়া। কেউ কেউ পনের-বিশ কাপ চা-ও অনায়াসে পেটে চালান করে দিচ্ছেন। কথায় বলে, ফ্রি পেলে বাঙালি নাকি আলকাতরাও খায়! আর এ তো ভোটের চা! কথাটা কতখানি সত্য তা বুঝতে হলে এখন গ্রামে-গঞ্জে যেতে হবে।
বিশ্বজুড়েই ভোট মানে এক এলাহি কারবার! বঙ্গদেশে ভোটের একটা আলাদা ঐতিহ্য আছে। এদেশে ভোট এলে বাপও দিব্যি ভাই হয়ে যান! প্রার্থীর সন্তানও মিছিলের সম্মুখভাগে স্লোগান দিতে দিতে গলা ফাটান, ‘আমার ভাই তোমার ভাই, কাসেম ভাই কাসেম ভাই! কাসেম ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই।’ কেবল কাসেম ভাই নয়- সালাম ভাই, মনির ভাই, লিটন ভাই- সব প্রার্থীর সন্তানই একই রকম স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপান!
অনেকে আবার ভিন্নধর্মী স্লোগান সেঁটে রাখছেন দেয়ালে। যেমন- একটি দেয়াল লিখন চোখে পড়েছে মিরপুর পাইকপাড়ায়। সেখানে লেখা আছে:‘ভোটের আগে ভাই ভাই, ভোটের পরে খবর নাই!’ একজনকে দেখলাম বেশ দার্শনিক এক উক্তি ফেস্টুনে লিখে ঝুলিয়ে দিয়েছে। বিশাল এই ফেস্টুনে লিখা: নূপুরের দাম হাজার টাকা, কিন্তু তার স্থান পায়ে? টিপের দাম এক টাকা হলেও তার স্থান কপালে। ইতিহাস সাক্ষী আছে, নুনে কখনো পোকা ধরেনি, কিন্তু মিষ্টিতে তো প্রতিদিনই ধরে, পিঁপড়াও ছাড়ে না।
মোমবাতি জ্বালিয়ে মৃত মানুষকে স্মরণ করা হয়, আর মোমবাতি নিভিয়ে জন্মদিন পালন করা হয়। মানুষ সোজা পথে চলতে চায় না আর বাঁকা পথে সবারই আগ্রহ বেশি। সেজন্যই মদ বিক্রেতাকে কারো কাছে যেতে হয় না, আর দুধ বিক্রেতাকে বাজারে যেতে হয়। আমরা দুধ বিক্রেতাকে সর্বদা বলি- দুধে পানি মেশাননি তো, অথচ মদে মানুষেরাই পানি মিশিয়ে খায়। আইন প্রণয়নের দায়িত্ব যাদের, তারা প্রতিশ্রুতি দেয় রাস্তাঘাট নির্মাণের! ভোটের সময় কাছে আসে, ভোট গেলে হারিয়ে যায়। মানুষ বড়ই আজব!’
অনেকে আবার প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করতে নানা ধরনের স্লোগান তৈরি করছেন। তেমন কিছু স্লোগান: ‘শুন হে মানুষ ভাই, ঐক্যফ্রন্টে গদিই সত্য, নীতি-আদর্শ কিছু নাই।’ ‘পুকুর তলায় টাকি মাছ, মহাজোট নেতারা ধান্দাবাজ’; ‘আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে, নেতা চুরি করে ধরা পড়ে, জেলখানাতে পচে মরে’: ‘মহাজোটের উন্নয়ন লুটপাটের রামায়ণ!’
‘ভোট দেবেন একবার, সেবা পাবেন বারবার’, ‘৩০ তারিখ ভোট দিন,... মার্কা দেখে নিন’। ‘এদিক-সেদিক যেদিকে যাই, আপনার কোনো তুলনা নাই’। ‘৩০ তারিখ শুভ দিন, ... মার্কায় ভোট দিন’। এই রকম আরও কত ছন্দ-স্লোগান। প্রতিটি স্লোগানের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে প্রতীক ও প্রার্থীর নাম।
ভোট এলে যেমন ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করে, তেমনি ভোটের খাওয়া, ভোটের ধাওয়াও জুটে কখনও কখনও! আশা করি ভোটের হাওয়া শান্তিপূর্ণভাবে বয়ে যাবে। আমরা ভোটের খাওয়া কিংবা ভোটের ধাওয়া খেতে চাই না। সবার জন্য ভোট হোক একটি নিরেট উত্সবের!
n লেখক :রম্য রচয়িতা