মেঠোপথ দিয়েই প্রবেশ করুক উন্নয়নের চাকা

বৃহত্তর অর্থে গোটা বাংলাদেশই একটি গ্রাম। সেই অর্থে আমরাও সবাই গ্রামীণ মানুষ। তারপরও গ্রামীণ জনপদকে আমরা ঠিক কেজো অর্থে বুঝি না। বুঝি না গ্রামীণ সংস্কৃতি। সামগ্রিকভাবে গ্রাম নিয়ে আমাদের চিন্তা অনিবার্য রোমান্টিক। এর একটি কারণ হতে পারে পথের পাঁচালির ‘নিশ্চিন্দিপুর’ এবং আরণ্যকের ‘নাঢ়া বইহার’ চিরদিনের জন্য গ্রামকে আমাদের কাছে রোমান্টিক করে রেখেছে। নাঢ়া বইহার গ্রামের পরিষ্কার লেপা-পোছা ছোট ছোট মাটির ঘর, পরিচ্ছন্ন খড়ের চাল, দেয়ালের গায়ে আঁকা মাটির পদ্ম লতাপাতা, পথে পথে ফুটে থাকা অজস্র অসংখ্য বুনো তেউড়ির ফুল, রোদ পোড়া মাটির সোঁদা গন্ধ এবং পাখির অভয়াশ্রম সরস্বতী কুন্ডী মনকে এমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে আমরা গ্রামীণ দরিদ্র, বেকার সমস্যাসহ গ্রামের বহুমাত্রিক সমস্যা আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। অনাবিল নিসর্গের সমান্তরালে রয়েছে চরাঞ্চলের দুর্ভোগ। গ্রাম ও গ্রামীণ জনপদকে রোমান্টিক আবহে ভাবার একটা আবহ গ্রামের সমস্যাকে একরকম দূরে ঠেলে রাখা। আমরা শহরের যানজট এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বলি, বায়ু দূষণ এবং কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কথা বলি, কিন্তু সময়ান্তরে গ্রামীণ জনপদও এই সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। গ্রাম ঘেঁষা মহাসড়কগুলোতে দ্রুতগতির ট্রাক বাসের সঙ্গে ধীর গতির নছিমন করিমন ভটভটির মিলিত যাত্রা যে কতশত দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে তা কি খুব বেশি গুরুত্ব পায় পরিকল্পনা ও নথিপত্রে ? ইটভাটাগুলি গ্রামীণ জনপদেই বেশি। যে কারণে বাতাসে দূষণের পরিমাণ শহরের চেয়ে গ্রামেও কোনো অংশে কম নয়। তারপরও আমাদের কাছে গ্রাম মানে নিশ্চিন্দিপুরের স্নিগ্ধ মেঠোপথ, যার একধারে মুথা কিংবা শ্যামা ঘাসের বন, দু’একটি খোয়া ভাঙা লাল সুড়কির স্নিগ্ধ সড়ক। এবং অতি অবশ্যম্ভাবী ঠিক দুপুরবেলা সেখানকার ঝোঁপালো কোনো উঁচু গাছের মগডাল থেকে করুণ সুরে ডেকে ওঠে তিলাঘুঘু। যে করুণ সুরের মধ্যে যেন লুকিয়ে থাকে সে অঞ্চলের সুদূর শত বছরের ইতিহাসের সুখ-দুঃখ। কল্পনা করতে ভালোবাসি গ্রামে এখনও দলে দলে ইন্দির ঠাকুরণ আছেন। দুপুরের আহার শেষে পৌষ মাসের অলস মধ্যাহ্নে যারা অদূরের বাঁশ বনের ঘন ছায়ায় মাখামাখি উঠোনে বসে কাঁথা বোনার সময়টিকে ভরিয়ে রাখেন নানান আনন্দের অনুষঙ্গে। বাঁশঝাড়ের মাথায় বিকেলের শেষ রোদটুকু শেষ হওয়ার আগেই শুকনো খড় মুখে ঘরে ফেরে লেজ ঝোলা হলদে পাখি। জ্যোত্স্নার রাতে ফুলের সুবাসে মাখামাখি বাতাস। শীতের পাখি ডাকা নির্জন উদাস সন্ধ্যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ঘন কুয়াশা। রেললাইনের দু’ধারে তাজা মটর শাকের ক্ষেত। উঁচু উঁচু গাছপালা জুড়ে নেমে আসা ঘন অন্ধকার। তবে গ্রাম নিয়ে আমাদের সাধারণের চিন্তায় যত কাব্যিকতাই থাক তাতে তেমন কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু গ্রাম নিয়ে নেতাদের ভাবনা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক। বিশেষত চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সফল করতে গ্রাম নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ভাবনায় অবশ্যই থাকতে হবে প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মিশেলে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। কেন গ্রামীণ তরুণরা দলে দলে শহরমুখী অভিবাসী হচ্ছে, তাতে শহরের ওপর কতটা চাপ বাড়ছে সবার আগে ভাবতে হবে সেটা। বাংলাদেশই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক। রাজধানীকেন্দ্রিকতার এই সংস্কৃতি একই সঙ্গে আমাদের গ্রামের সংস্কৃতির শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আবার প্রশাসনিক বিন্যাসকেও করে তুলছে ভারসাম্যহীন।

সময়ান্তরে নিশ্চিন্দিপুরের মত গ্রামগুলো বদলে গেছে। বদলে গেছে সেখানকার অপু-দুর্গার জীবনও। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও এখন আর কোনো অপু-দুর্গাকে পাওয়া যাবে না যারা অত্যুত্সাহে মাইলের পর মাইল মাঠ বিল জলাভূমি ধানক্ষেত বেতঝোঁপ পেরোতে পারে একখানা রেলগাড়ি দেখার জন্য। ঘোর প্রান্তিক গ্রামের আট বছরের বালকও এখন মোবাইলের নানান ডিজিটাল ডিভাইসের সঙ্গে পরিচিত। অপুর মত কোনো সরল বালকও আর নেই। যে বিশ্বাস করে সন্ধ্যা পেরোনোর আগে ঘরে না ফিরলে কোথাও কোনো এক আঁঁতুড়ে ডাইনি প্রাণ কেড়ে নিয়ে কচুর পাতায় বেঁধে পুকুরের অতলে ডুবিয়ে রাখতে পারে। অষ্টপ্রহর ভিটেমাটি ঘুরে বেড়ালেও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনো ভিটের শেয়াল।

আমাদের বন-বাদাড়, নদীর চর, বিল, হাওর-বাঁওড়ের জলাভূমি এবং ফাঁকা মাঠে যে পরিমাণ পাখি আসে তার প্রত্যেকটিই হতে পারে একেকটি পর্যটনকেন্দ্র। টেকনাফের পাহাড়ি চিরসবুজ বনাঞ্চল, সিলেটের রেইন ফরেস্ট এবং রিডল্যান্ড ফরেস্ট বৃহত্তর দিনাজপুর ময়মনসিংহের গারো অঞ্চল মধুপুর ভাওয়ালের শালবন সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ সোমেশ্বরী নদীর উপত্যকা মাধবকুন্ডু জলপ্রপাত রেমাকালেঙ্গা সুনামগঞ্জের হাওর ও সাতছড়ি চট্টগ্রাম পতেঙ্গা তো আছেই। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জলাভূমিই হতে পারে পাখি দর্শকদের জন্য একেকটি ট্যুরিস্ট স্পট। গ্রামের খোলামেলা পরিবেশ ঠিক রেখে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে আবাসন ব্যবস্থায়ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়। আমাদের দরকার মোনাজাতউদ্দিনের মত সাংবাদিক। যারা গ্রামকে শহরবাসীর নজরে নিয়ে আসবেন। দরকার সেই জননেতাও যিনি গ্রাম নিয়ে ভাববেন।

n লেখক :প্রাবন্ধিক