চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে উত্পাদিত বনজ সম্পদের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় ছয় প্রজাতির বাঁশ উত্পন্ন হয়ে থাকে। এসব বাঁশের মধ্যে রয়েছে মূলি বাঁশ, ডলু বাঁশ, নিতিয়া বাঁশ, ওরা বাঁশ, বাইজ্জা বাঁশ, মহাল বাঁশ প্রভৃতি। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে উত্পাদিত বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ আমাদের দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে এবং চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপার মিলে কাগজ উত্পন্ন করতে লাগে। কিন্তু বাঁশ উত্পাদন এবং সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর কারণ অতীতে যেভাবে বাঁশের ব্যবহার হতো, বর্তমানে বাঁশের ব্যবহার আগের মত হয় না। আগে সবাই বাঁশের বেড়ার ঘর নির্মাণ করত। বর্তমান আধুনিক যুগে সবাই পাকা ঘর নির্মাণ করছেন। বাঁশের ব্যবহার কমে গেলেও এখনও পাকা ঘর নির্মাণ কাজে বাঁশের ব্যবহার হয়। সুতরাং এর ব্যবহার একেবারে কমে গেছে তা বলা যথার্থ হবে না।
পার্বত্য অঞ্চলে উত্পাদিত বাঁশ নদী ও সড়ক পথে চট্টগ্রামে আসে। অতীতকালে দুর্গম পাহাড় থেকে বাঁশ আনতে অনেক কষ্ট হতো। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় বাঁশ পরিবহনে তেমন সমস্যা হয় না। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে উত্পাদিত বাঁশ সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে উত্পাদিত বাঁশের ব্যবসার সাথে প্রায় লক্ষ লোক জড়িত আছে। আগে বাঁশের ব্যবসা করতে তেমন সমস্যা হতো না। বর্তমানে বাঁশের ব্যবসা করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চল থেকে চট্টগ্রামে বাঁশ আনতে গিয়ে পথে পথে পুলিশ এবং ফরেস্ট বিভাগের লোকদের হাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁশের দাম আগের তুলনায় অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাইজ্জা বাঁশ প্রতি হাজার ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, মূলি বাঁশ প্রতি হাজার ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা, নিতিয়া বাঁশ প্রতি হাজার ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ও ডলু বাঁশ প্রতি হাজার ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে উত্পাদিত বাঁশের সিংহভাগ ব্যবহূত হয় কর্ণফুলী পেপার মিলে কাগজ উত্পাদনে। কর্ণফুলী পেপার মিলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কর্ণফুলী পেপার মিলে উত্পাদিত কাগজের জন্য সব ধরনের বাঁশ ব্যবহূত হয়। পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কাগজ তৈরি করা হয়। কর্ণফুলী পেপার মিলে প্রতি মাসে পূর্ণ উত্পাদনের সময় সাত/আট হাজার টন বাঁশ লাগে। মাঝে-মধ্যে বাঁশের সংকটের কারণে কাগজের উত্পাদন ব্যাহত হয়। পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাঁশ আহরণ করা খুবই কষ্টকর ব্যাপার। বর্তমানে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে যেভাবে বন নিধন চলছে তাতে বাঁশের উত্পাদন কমে যাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে বাঁশ আহরণ করা হলেও বাঁশের উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এখানে কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রাকৃতিকভাবে বাঁশের উত্পাদন হয়ে থাকে। বাঁশের উত্পাদন আগের তুলনায় কমে গেলেও ইদানীং পার্বত্য অঞ্চলে বাঁশের চারা অবাধে নিধন চলছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বাঁশের চারা (স্থানীয় ভাষায় বাঁশ বারুল) পার্বত্য অঞ্চলের লোকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় সবজি হিসেবে পরিচিত। বাঁশের চারা সুস্বাদু হওয়ায় স্থানীয় বাজারে নিয়মিতভাবে বাঁশের চারা বিক্রি হয়ে থাকে। অবাধে বাঁশের চারা নিধনের ফলে বাঁশের উত্পাদন অনেক কমে গেছে। বাঁশের চারা নিধনের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাঁশের উত্পাদন স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে বাঁশের চারা নিধন বন্ধ করতে হবে। বাঁশের উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে যেভাবে বন নিধন এবং বাঁশের চারা নিধন চলছে তাতে বাঁশের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। তাই বাঁশ শিল্পকে রক্ষার লক্ষ্যে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কারণ বাঁশ সম্পদ আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এক বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছে। বাঁশ শিল্পকে রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
n লেখক : বীমা কর্মকর্তা