১৬ই ডিসেম্বর আমাদের অনন্ত প্রেরণা

আফরা মেহজাবীন শীন

 

‘কী দেখার কথা কী দেখছি

কী শোনার কথা কী শুনছি

কী ভাবার কথা কী ভাবছি,

কী বলার কথা কী বলছি।

তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।’

১৯৭১ থেকে ২০১৮—৪৭ বছরের এই জীবনকাল স্বাধীন বাংলাদেশের। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সংস্কৃতিক বিভিন্ন চড়াই উতরাই পার হয়ে এই বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে ঈর্ষণীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পথ কুসুমাকীর্ণ নয়। হায়দার হোসেনের লেখা ওপরের গানের লাইনগুলো থেকেই বোঝা যায়—এই পথ চলাটা ছিল কতটা কষ্টের, যেখানে কখনো কখনো আমাদের স্বাধীনতাকেই হারাতে বসেছিলাম আমরা। তবে বাঙালির অটুট ঐক্যের পাশাপাশি ছিল প্রেরণা। সেই প্রেরণা হলো বিশেষ সেই দিনের, যেদিন জেনারেল নিয়াজি প্রায় ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। আমাদের অনন্ত প্রেরণার দিন ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের বিজয় দিবস।

‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী

অবাক তাকিয়ে রয়,

জ্বলেপুড়ে মরে ছারখার

তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এবং ১৯৭১ থেকে ২০১৮ কোথাও বাঙালিরা মাথা নোয়ায়নি। বাংলাদেশ গঠন করার জন্য ত্রিশ লাখ প্রাণের আত্মত্যাগ সাহস যুগিয়েছে বাঙালিকে। বিজয় সবসময় নতুন কিছু করবার প্রেরণা হয়ে থাকে। ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ও তেমনি আমাদের এগিয়ে চলার মশাল। যেটি উন্নয়নের এই কণ্টকাকীর্ণ পথকে আলোকিত করে রেখেছে এবং অনন্তকাল করে রাখবে। কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাঁর ‘ছবি’ কবিতায় লেখেন:

‘খাঁটি আর্যবংশ সম্ভুত শিল্পী কঠোর তত্ত্বাবধানে

ত্রিশ লক্ষ কারিগর

দীর্ঘ ন’টি মাস দিনরাত পরিশ্রম করে বানিয়েছেন এই ছবি।

এখনো অনেক জায়গায় রং কাঁচা কিন্তু কী আশ্চর্য গাঢ়..’

১৯৭৫ সালে জারি করা সামরিক শাসন ১৫ বছর স্থায়ী থাকে। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসন পতনের পেছনে মূল প্রেরণা ছিল ১৬ই ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা এবং দেশপ্রেমের চেতনাকে সামনে রেখে এগিয়ে ছিল বাঙালি আর বাঙালি একতার জয় অবশ্যম্ভাবী। বিজয় দিবসের প্রেরণাকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলেছি আমরা এই ৪৭টি বছর।

নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস মাত্র, তবু এই প্রজন্ম জেগে ওঠে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে। লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং মানব পতাকা তৈরি করে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছে এই প্রজন্ম, যার অনুপ্রেরণা নিঃসন্দেহে সেই বিজয় দিবস।

‘বিজয় দিবস বিজয় দিবস

আজ বিজয়ের মাস

শহীদ প্রাণের রক্তে ভেজা

সবুজ হলো ঘাস।’

ছোট ছোট বাচ্চারা কবিতা আবৃত্তি করে স্বাগত জানায় বিজয় দিবসকে। দেশের গান, নাচ, নাটক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে পালিত হয় ১৬ই ডিসেম্বর। আর এই উদযাপনের মাধ্যমেই অনন্তকালের জন্য ১৬ই ডিসেম্বরের প্রেরণা প্রোথিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের অন্তরে।

‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

সারা বিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার।’

১৬ই ডিসেম্বর কেবল একটি তারিখ নয়, এটি কোটি কোটি বাঙালির হূদয়-প্রদীপ। ১৬ই ডিসেম্বর সেই স্ফুলিঙ্গ যা যে কোনো অন্যায়ে বাঙালির হূদয়ে অগ্নি সংযোগ করে। ১৬ই ডিসেম্বর সেই শেকড় যা বাঙালি জাতির প্রতিটি আন্দোলন ও পথ চলাকে পুষ্টি ও জল দিয়ে সচল রাখে। ১৬ই ডিসেম্বর সেই অহংকার যেটি বাঙালি জাতিকে পুরো বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়। ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের সেই প্রেরণা যেটি অনন্তকাল পর্যন্ত লাল সবুজ পতাকাকে পতপত করে ওড়াতে থাকে।

সপ্তম শ্রেণি, সরকারি পি এন স্কুল, রাজশাহী