আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘খামোশ বললেই জনগণ চুপ হবে না। লজ্জা কম বলেই সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তারা খামোশ বলতে পারেন। জনগণকে এদের বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ, জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীর স্বজনসহ হত্যা ও দুর্নীতির মামলায় সাজা প্রাপ্তদের আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট। কেউ আবার পাকিস্তানী হানাদারবাহিনীর দোসর। এর মাধ্যমে তারা (বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট) দেশের রাজনীতিটাকে অপরাধ জগতে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে যারা এ ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ করেছে তাদের নির্বাচিত করে তারা দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর তারা জাতির কাছে দিতে পারবে কি? জনগণকে এদের বিষয়ে সচেতন হতে বলবো। এ অপরাধীরা যাতে ভোট না পায়।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমেরিকার কংগ্রেস থেকে একটি তালিকা পাঠিয়েছে সেখানেও জঙ্গিবাদী হিসেবে এদের নাম রয়েছে এবং ইতিমধ্যেই কানাডার আদালত বিএনপিকে একটি জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এরা যদি নির্বাচিত হয়ে দেশের ক্ষমতায় আসে তাহলে সেই দেশের অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে? মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা কিভাবে থাকবে? এদেশে শান্তি এবং অগ্রগতি কিভাবে হবে? কোনদিনও হবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, কাদের সিদ্দিকী, মান্নারা এত আবেগ দিয়ে জ্ঞানগর্ভ লেখা এবং বিবেকের কথা বলেন। এখন কোথায় গেলো তাদের সেই বিবেক? ওই ধানের শীষে তারা এবার নির্বাচন করছে। রাজনীতিকে কোথায় নামিয়েছে? তারা লজ্জা পায়? নাকি পায় না? তারা যদি ক্ষমতা যায় তাহলে দেশের ভাগ্যে কী ঘটবে সেটাই আমার প্রশ্ন?’ ড. কামাল হোসেনের উদ্দেশে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘খামোশ (চুপ) বললেই কি মানুষের মুখ খামোশ হয়ে যাবে? খামোশ বললে মানুষের মুখ খামোশ হবে না, মানুষকে খামোশ রাখা যাবে না।’ তিনি বলেন, তবে তাদের লাজ-লজ্জা কম আছে। এ কারণে একজন প্রশ্ন করতেই তাকে খামোশ বলে দিলো।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ওয়াদা ছিল জাতির কাছে ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো। সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করি এবং অনেকের বিচারের রায় ও কার্যকর হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আজ আমরা দেখি যারা এই মানবাধিকারবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত তাদেরই পরিবারবর্গকে, আপনজনকে নিয়ে বিএনপিসহ জোট করা হয়েছে। সেই জোটে অনেকেই এখন আছে।
চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, তাদের দোসর এবং জঙ্গিবাদ এবং হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্তদের নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধাননমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে বলবো অপরাধীদেরকে ভোট দেবেন না, এই অপরাধীরা বাংলাদেশে যেন আর কখনও নির্বাচনে প্রতিনিধি হয়ে আসতে না পারে । যে সব এলাকায় তারা দাঁড়িয়েছে (নির্বাচনে) তাদেরকে চিহ্নিত করুন এবং তাদেরকে একেবারে বয়কট করে দিন। এরা ক্ষমতায় আসলে এদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এদেশের অগ্রগতি ব্যহত হবে, এদেশের ভাগ্য গড়ার জন্য আজকে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নটা হচ্ছে সেটাও থেমে যাবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণে, দেশের মঙ্গলে, উন্নয়নের জন্য। আজ সেখানে এই অপরাধী যদি এসে যায় তাহলে দেশের ভাগ্যে কি ঘটবে?’
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, দলের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পরভীন জাহান কল্পনা, ঢাকা মহানগর দক্ষিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। শহীদ সন্তানদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন নুজহাত চৌধুরী, শমী কায়সার। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
এর আগে সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ভবনের সামনে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রধানমন্ত্রী দেশে ’৭৫ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদের একটি অংশ এবং ৩৮ অনুচ্ছেদের অর্ধেক ‘মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাতিল করে দিয়ে জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের ভোটের অধিকার দেয়, রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেয় এবং পুরো সংবিধানকে অকার্যকর করে ফেলে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া যাদের মন্ত্রী বানিয়েছিল তারাও যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত। যারা আজকে এদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে তারাইবা এ লজ্জাটা কোথায় রাখবে? প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিএনপি’র মনোনয়ন লাভকারীদের মধ্যকার অপরাধীদের খতিয়ানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-২ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে মওলানা আব্দুল হাকিমকে। সে ছাত্রসংঘের (পরবর্তীতে ইসলামী শিবির) এবং আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিল এবং পকিস্তানি বাহিনীকে পথঘাট চিনিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজগুলো এরাই করেছে। পাবনা-১ আসনে দেওয়া হয়েছে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নজিবুর রহমানকে। এই নিজামীর ফাঁসি হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে। যার বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সব থেকে বেশি সম্পৃক্ততা ছিল। কক্সবাজার-২ আসনে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সেও একজন যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধী। পিরোজপুর-১ আসনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে শামীম বিন সাঈদীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বগুড়া-৩ আসনে বগুড়া অঞ্চলে ’৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এবং পলাতক মোমিন তালুকদারের স্ত্রী মাসুদা মোমেন তালুকদারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। খুলনা-৫ এ যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এবং ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনে অংশ নেওয়া মিয়া গোলাম পরোওয়ারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সাতক্ষীরায় যুদ্ধাপরাধী গাজী নজরুল ইসলাম, চট্টগাম-৪ আসন থেকে ইসহাক চৌধুরী, যার ভাই আসলাম চৌধুরী ভারতে বসে ইসরাইলি গোয়েন্দা মোসাদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। রংপুর-৩ আসনে জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার আসামি মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানের স্ত্রী রিটা রহমানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। নেত্রকোনা-৪ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি লুত্ফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামানকে। কুমিল্লা-৬ আসনে মনোনয়ন পেয়েছে ড. মোশাররফ হোসেন, যার কণ্ঠস্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সাথে সে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাইয়ের কথা দেশবাসী এখনও ভুলে যায়নি। সেই বাংলা ভাইকে যারা সৃষ্টি করেছিল, মদদ দিয়েছিল তাদের মোটামুটি সবাই এখন নমিনেশন পেয়ে গেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন- রাজশাহী-১ থেকে ব্যারিস্টার আমিনুল হক, বাংলা ভাই এবং জঙ্গিবাদ সৃষ্টিতে তার হাত আছে। রাজশাহী-২ আসনের মিজানুর রহমান মিনু, তারও হাত আছে। মহিমা এবং ৬ বছরের শিশু রাজুফাকে গণধর্ষণের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। এছাড়া রুহুল কুদ্দুস তালুকদার নাটোর-২, নাদিম মোস্তফা নওগাঁ-৬ এর প্রার্থী আলমগীর কবির এদের সবার সঙ্গে জঙ্গিবাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যারিস্টার আমিনুল হক মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আমেরিকার এফবিআই’র হাতে ধরাও পড়েছে। তারা টাঙ্গাইল-২-তে যাকে মনোনয়ন দিয়েছে সে হচ্ছে সেই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি খালেদা জিয়ার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই। শেখ হাসিনা বলেন, এভাবে জামায়াতের ২২ জন এবং তাদের দলে যারা যারা অপরাধী বা অপরাধীর পরিবার তারাই মনোনয়ন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার বিরুদ্ধেও এসব ষড়যন্ত্রকারী মিগ টুয়েন্টি নাইন কিনে দুর্নীতির অভিযোগ করলেও তা প্রমাণে ব্যর্থ হয় উল্লেখ করে বলেন, ‘বিশ্ব ব্যাংকও পদ্মা সেতু নিয়ে আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়।’
শেখ হাসিনা বলেন, আমি দেশবাসীকে আহবান জানাবো- আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি। এজন্য আমাদের দেশের জনগণ এবং বহু নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জীবনের বহু বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে এনেছি। এই অর্জনকে আমাদের ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।