১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওখানে তখন পাকিস্তানি আর্মির দুটি ব্যাটেলিয়ান রয়েছে। পিজি হাসপাতালের ওপরে ছিল ছয়জন। রেডিও স্টেশনের ভেতরেও ছিল বেশ কয়েকজন। আমি তো এসব জানি না কিছুই। ওরা সবই দেখছে। এদিকে আমরা তো সবাই সবাইকে আলিঙ্গন করছি। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছি। হঠাত্ দেখি রেডিও পাকিস্তানে তখনো পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। দেখেই আগুন জ্বলে উঠল যেন মাথায়। আমি তখন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে এগিয়ে গেলাম রেডিও স্টেশনের দিকে। ওখানে আগে এত বেশি পাহারা ছিল না। যুদ্ধের কারণে পাহারা অনেক মজবুত করেছে। দেয়ালের উপর উঠে দেখি জাল দিয়ে চারিদিক ট্রেস করা। একজন ক্যাপ্টেনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। আমি বাইরের ওদের আরও জোরে জোরে স্লোগান দিতে বললাম। আমি লাফ দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ওইসময় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের একজন কর্মকর্তা আমাকে দেখে এগিয়ে এল। আমাকে দেখে বলল, স্যার রেডিও স্টেশনে কীভাবে যেতে হয় আমি জানি। তার দেখানো পথে এগিয়ে গেলাম।
আমাদের দেখে পাকিস্তানিদের একজন এগিয়ে এল। আমি আরও সাহস পেলাম। বলতে লাগলাম, আই অ্যাম প্লাটুন কমান্ডার। মাই নেম ইজ শাহাবুদ্দিন। সারেন্ডার, সারেন্ডার। ওপেন, ওপেন। এদিকে পাকিস্তানিরা তো আগেই শুনেছে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে। সবমিলিয়ে ওরা কনফিউজড হয়ে গেছে। আবার আমার মতো একজন তরুণকে দেখে বিশ্বাসও করতে কষ্ট হচ্ছে ওদের। মেনে নিতে পারছে না। ওরা বলতে লাগল, ঠিক হ্যায়।
ভেতরের দিকে ঢুকতেই দেখি কেমন অন্ধকার। ছাদে যাব কীভাবে বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কন্টিনেন্টালের ওই ছেলেটাও ছিল আমার সঙ্গে। সে বলতে লাগল, অনেক দিন আগে এসেছি ঠিকঠাক চিনতে পারছি না। ভেতরে কোনো আলো নেই সব অন্ধকার। সেও ঠিক চিনে উঠতে পারছে না। আমি বললাম, কোনো সমস্যা নেই। উপরে যেতে থাকি। অন্ধকারেই এগোতে এগোতে তিনতলায় অর্ধেক পর্যন্ত গিয়েছি এমন সময় কেমন একটা গোঙানির আওয়াজ শুনতে পেলাম। দেখি হাফপ্যান্ট পরা খালি গায়ে বারো তেরো বছরের একটি ছেলে বসে আছে। শুনলাম তিন দিন আগে স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে। এই তিন দিন ধরেই ও এখানে আটকে আছে। ভয়ে বেরও হতে পারে না। বের হতে গেলে তো মেরে ফেলবে। তো আমাদের দেখেই ছেলেটি বলতে লাগল, স্যার এদিক দিয়ে আসেন। ছাদে উঠার রাস্তাটা দেখিয়ে দিল। ছাদে উঠে নিচে তাকাতেই দেখি হাজার হাজার জনতা।
রেডিও স্টেশনের পেছনে তাকাতেই দেখি পাকিস্তানি সোলজার। শুধু রেডিওটা প্রোটেক্ট করার জন্য পিজি হাসপাতালের উপর থেকে পাহারা দিচ্ছে ছয়জন সোলজার। ভয় পেয়ে গেলাম ভীষণ। কিন্তু পিছু হটলাম না। পাকিস্তানের পতাকাটা নামিয়ে ছিঁড়ে বাংলাদেশের পতাকাটা উড়িয়ে দিয়েই স্লোগান দিলাম ‘জয় বাংলা’। সময় তখন সকাল ১১টা। এটা দেখে ওরা আর মেনে নিতে পারেনি। পিজি হাসপাতালের উপর থেকে লাইটমেশিনগান দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে আরম্ভ করল। ইন্টারকন্টিনেন্টালের ওই ছেলে আর সেই শিশুটির গায়ে এসে গুলি লাগল। তারা সেখানেই মারা যায়।
এদিকে আমি কী করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। একবার এদিকে যাই, আবার অন্যদিকে। ধোঁয়ায় ভরে গেছে চারদিক। গন্ধ বেরুচ্ছে। এখন লাফ দিব কিনা ভাবছি। শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে সিঁড়িতে এসে পড়লাম। তখনো পিচ্চি ছেলেটা ‘পানি পানি’ করে আর্তনাদ করছে। আমি শুনছি কিন্তু যেতে পারলাম না। ওখান থেকেই দেখতে পেলাম, আমার এক বন্ধুর ছোট ভাই মফিকের গায়ে গুলি লেগেছে। আমার ভাইও তখন ওখানেই। আমি তো ধরেই নিলাম আমার ভাই বুঝি মারা গেছে। এখন তো আমি বিপদে পড়ে গেলাম। কী করে বের হব! আমি তো এখন একা হয়ে গেছি। চুপচাপ ওখানেই বসে রইলাম। যখন পতাকা ওড়ালাম তখন ১১টা ২০ বাজে। তো বসে থাকতে থাকতে ভাবলাম যা হওয়ার হবে— আমাকে নামতে হবে। সাড়ে ১১টার দিকে নেমে এলাম। তখন আর ভয় নেই মনে। একেবারে যেন মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বের হয়ে এলাম ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে। (‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বই থেকে সংকলিত)
লেখক:মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা বাহিনীর ১৭ নম্বর প্লাটুনের কমান্ডার ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী