ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিমল রায় আর নেই

ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কালের সাক্ষী যশোরবাসীর অতি পরিচিত মুখ বিমল রায় চৌধুরী আর নেই। বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত বিমল রায় চৌধুরী শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। বিকেলে শহরের বেজপাড়ার বাসভবনের সামনে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সন্ধ্যায় নীলগঞ্জ মহাশশ্মানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

জিলা স্কুলে পড়াকালীন ১১ বছর বয়সেই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হন তার বাবা। ১৯৩৬ সালে জিলা স্কুলে পড়াকালীন ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪২ সালে প্রথম বিভাগ পেয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় ক্যাম্বেল হাসপাতালে (নীল রতন সরকার মেডিকেল অ্যান্ড হাসপাতাল) এল. এম. এফ কোর্সে ভর্তি হন। ওই বছর ৯ আগস্ট মেদিনীপুর রেভলিউশন শুরু হলে রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে ১২ আগস্ট তিনি বন্ধু-বান্ধবসহ ৭ জন মেদিনীপুর গমন করেন। ১৭ আগস্ট মেদিনীপুর থেকে ফেরার পথে গ্রেফতার হন। মাসখানেক পরে তদন্ত করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি অথবা ব্যবসার দিকে না ঝুঁকে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৪৯ সালে তেভাগা আন্দোলনে বাঘারপাড়া ও নড়াইলের নমঃশূদ্র অধ্যূষিত এগারখান অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন। এ আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে তিনি গ্রেফতার হন এবং একমাস পর মুক্ত হন। তিনি মাতৃভাষা রক্ষায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেফতার হন এবং ১৫ দিন পরে মুক্তি পান।
 
১৯৫৪ সালের ৩০ মে তিনি ৫৪ ধারায় গ্রেফতার হন এবং প্রায় দেড় বছর কারাভোগ করার পর ১৯৫৬ সালে মুক্তি পান। কারাগারে আন্দোলন করার অপরাধে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দু’মাস, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে তিন মাস ও কুমিল্লা কারাগারে দু’মাস রাজবন্দী হিসেবে কারাযাপন করেন এবং বাকি সময় তিনি ঢাকা ও বহরমপুর কারাগারে বন্দী থাকেন। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয় এবং কিছুদিন পর মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় তাকে আবার গ্রেফতার করা হয় এবং দুইমাস পরে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে জড়িত থাকেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি আবারও গ্রেফতার হন এবং কিছুদিন পর মুক্তি লাভ করেন। 

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের তেভাগা আন্দোলন মেনে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সরকার কায়েমের শর্তে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৩১ মার্চ পাক সেনারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে নওয়াপাড়া চৌধুরী বাড়ি আক্রমণ করে। ৮ এপ্রিল কেশবপুর, সাতক্ষীরায় অবস্থান করেন এবং ১৮ এপ্রিল ভারতে প্রবেশ করেন এবং বনগাঁ ক্যাম্পে ৪টি মুক্তিযুদ্ধের শিবিরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮ আগস্ট তিনি পলিটিক্যাল লিয়াঁজো হিসেবে আহত মুৃক্তিযোদ্ধাদের সেবার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গোহাটি ও সিলং থেকে মুক্তিযুদ্ধের পলিটিক্যাল ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর ফিরে আসেন তিনি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।

ইত্তেফাক/এমআই