সিলেটের স্বপ্নপূরণ হয়েছে

রাজিন সালেহ

স্বল্প মেয়াদের জন্য হলেও বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে ২৪টি টেস্ট ও ৪৩টি ওয়ানডে খেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন প্রায় ১৮ বছর। অবশেষে সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিয়েছেন সিলেটের তারকা রাজিন সালেহ। নিজের বিদায়, বাংলাদেশের ক্রিকেট, নিজের স্বপ্ন ও সিলেটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে ইত্তেফাককে দেওয়া সাক্ষাত্কারে কথা বলেছেন রাজিন। এই একান্ত সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—

হঠাত্ অবসর নিয়ে নিলেন কেন?

আমি বাংলাদেশ দলে খেলেছি। জাতীয় লিগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ খেলেছি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলেছি। এখন দেশে যে কম্পিটিটিভ ক্রিকেট শুরু হয়েছে, তাতে যুদ্ধ করে টিকে থাকাটা একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। জাতীয় লিগ বা বিসিএলে সমস্যা হচ্ছিল না। ওখানে আমি পারফরম করছিলাম; ফলে খেলার সুযোগও পাচ্ছিলাম। কিন্তু ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে গত বছর আমি টিম পাইনি। যদিও এর আগের বছর পারফরম করেছিলাম। কেন পাইনি, জানি না। এই অবস্থায় ভাবলাম, সম্মান থাকতে থাকতে খেলা ছেড়ে দেওয়া ভালো। যতটুকু খেলেছি, সম্মান নিয়েই খেলেছি।

অবসরের পরেও ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকতে চান?

অবশ্যই। আমাদের সিলেট থেকে ভালো খেলোয়াড় বের হচ্ছে না। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে জাতীয় দলের আশেপাশে কেবল জাকির হাসান আছে। এ ছাড়া আর ব্যাটসম্যান নাই। সিলেট দলও জাতীয় লিগে ভালো ফল পায় না অনেকদিন। ছেলেরা পরিশ্রম করে, কিন্তু ভালো ফল আসছে না। আমি মনে করি, এখানে সঠিক প্রশিক্ষণ এই ছেলেরা পাচ্ছে না। আমি সেটা করতে চাই। বাংলাদেশের ক্রিকেট, সিলেটের ক্রিকেট আমাকে অনেক দিয়েছে। আমি এখন ক্রিকেটের জন্যই কিছু করতে চাই।

লম্বা এই সময় ধরে ক্রিকেট খেললেন। ২০০৮ সালের পর জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন আর দেখেননি?

একটা সময় পর্যন্ত স্বপ্নটা ছিল। ২০০৮ সালে শেষ ম্যাচ খেলেছি। এরপর অন্তত ৫ বছর আমার ওই স্বপ্নটা ছিল। এর মধ্যে ২০১১ আর ২০১২ সালে আমি জাতীয় লিগে সেরা দুই রান সংগ্রাহকের মধ্যে ছিলাম। তখন আশা করেছিলাম যে, জাতীয় দল না হোক, অন্তত ‘এ’ দলে ডাক পাবো। সেখান থেকে নিজেকে প্রমাণ করতে পারলে হয়তো জাতীয় দলে যেতে পারবো আশা ছিল। যে কোনো কারণেই হোক, সেটা হয়নি। কিন্তু ২০১৩-১৪ সাল পর্যন্ত সেই সুযোগটা যখন এলো না, তখন আমি শুধু ঘরোয়া ক্রিকেটেই মন দিয়েছি। শেষ দিকে আর ওরকম কোনো স্বপ্ন ছিল না।

আমাদের এখানে তিরিশ পার করা পারফরমাররা আর জাতীয় দলে ফিরতে পারে না কেন? তুষার যেমন পারছেন না...

এটা আসলে বলা কঠিন। তিরিশ পার করা সবাই তো তুষারের মতো খেলছে না। তুষারের ক্ষেত্রে কেন ও চান্স পাচ্ছে না, সেটা আমার বলা কঠিন। তবে এখানে তিরিশ পার করে ফেললে মনে করা হয়, বুড়ো হয়ে গেছে। ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় আপনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪০ বছরেরও পারফরমার পাবেন। তারা যে জাতীয় দলে খেলার জন্য খেলছে, তা নয়। তারা খেলার জন্যই খেলছে।

আপনাদের সময়ের থেকে জাতীয় দল কতটা বদলে গেছে?

রাত আর দিন তফাত। আমরা যখন বাংলাদেশ দলে খেলেছি, তখন ম্যাচ উইনার খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। হয়তো কেউ একজন অসাধারণ খেললে একটা জয় আসতেও পারতো। আর এখন দলে ৫ জন সিনিয়র ক্রিকেটার আছে, এরা নিয়মিত ম্যাচ জেতাচ্ছে। তরুণও অনেক ভালো ক্রিকেটার। এই দল নিয়মিত জয় পায়। এদের সঙ্গে আমাদের তুলনাই হয় না।

এক সময় জাতীয় দলে এক সঙ্গে ৬ জন সিলেটের খেলোয়াড়ও খেলেছেন। এখন সিলেটের খেলোয়াড়দের খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই অবস্থা কেন সিলেটের?

সিলেটে আমরা যখন উঠে এসেছি, তখন আজকের মতো সুযোগ সুবিধা হয়তো ছিল না। কিন্তু আমরা ওই সময়ে খুব ভালো প্রশিক্ষণ পেয়েছি বড় ভাইদের কাছ থেকে। আজকের ছেলেরা সেটা পাচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।

সিলেট নিয়েই প্রশ্ন দিয়ে শেষ করা যাক। সিলেটে এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হচ্ছে। কেমন লাগে?

আমি, অলক, এনাম এক সময় যখন সিলেটে আড্ডা দিতাম, এরকম বলাত যে, এখানে একদিন আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম হবে। আমরা এখানে টেস্ট খেলে অবসর নেব। সেটা তো আর হলো না। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তাতে আর কী! সিলেটের স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। সিলেটের তরুণরা এখন ক্রিকেটে আরও আগ্রহী হবে। তারা চোখের সামনে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের বিশালত্ব দেখে বড় হবে, স্বপ্ন দেখতে পারবে।