চিন্তার চর্চা ও বিকাশ দরকার

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তারও পরিবর্তন ঘটছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, মানুষ চিন্তার চর্চা করছে না। কল্পনা থেকে চিন্তার জন্ম হয়। সেই কল্পনা বাস্তব কিংবা অবাস্তব—দুটোই হতে পারে। বাস্তব কল্পনা জীবনবোধ তৈরি করে, অবাস্তব কল্পনা স্বপ্ন ও বিশ্বাস তৈরি করে।

মানুষ যখন মানুষকে নিয়ে কল্পনা করে, তখন সেখান থেকে চিন্তার উত্পত্তি ঘটে। সে চিন্তা যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে। কারণ সেই চিন্তায় জীবনবোধ থাকে, আত্মত্যাগ ও উদারতা থাকে। যেমন, একজন মানুষ উদোম শরীরের আরেকজন মানুষকে তীব্র শীতের সঙ্গে লড়াই করতে দেখছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তার বাড়তি গায়ের চাদরটি বিপন্ন মানুষটিকে পরিয়ে দিয়ে তার শীত নিবারণের চেষ্টা করল। এতে খুব দ্রুত একটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জন্ম নিল। এটাই অবচেতন মনের চিন্তা। যেটা কল্পনা দ্বারা তাড়িত হয়ে একজন মানুষের মধ্যে জীবনবোধ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি হলো র্যাপিড কগনিশন বা দ্রুত চিন্তন। তবে মানুষের মধ্যে সচেতন মন বেশি সময় ধরে কাজ করে মানুষকে পরিকল্পিতভাবে চিন্তা করার শক্তি জোগায়। সহজ কথায় বলা যায়, সজাগভাবে মানুষ যখন চিন্তা করে, তখন সেখানে সচেতন মন তৈরি হয়। অবচেতন মনের কল্পনা ও প্রতিক্রিয়া স্বল্পস্থায়ী; কিন্তু সচেতন মনের কল্পনা ও প্রতিক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী।

তবে এর ব্যতিক্রমও ঘটতে পারে। সচেতন মন থেকেও চিন্তাশক্তি ক্রমাগত বাস্তবে সফলতা লাভ করে। যেমন, ক্যানসার গবেষণা; অবচেতন মনের চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। দীর্ঘসময়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই শেষে বিজ্ঞানীরা ক্যানসারসংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল নিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এখন ন্যানোপার্টিকেল প্রযুক্তি বিস্ময়করভাবে পৃথিবীকে পালটে দিচ্ছে। ন্যানোপার্টিকেল হলো ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটারের এক বা একাধিক স্তরবিশিষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা। দেখতে পাউডারের মতো হলেও এ ধরনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণার বিভিন্ন আকার ও আকৃতি আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যানসার গবেষণায় ন্যানোপার্টিকেল ব্যবহূত হচ্ছে। চাইনিজ একাডেমি সায়েন্স ও সাংহাই ইনস্টিটিউট অব সিরামিকসের গবেষকরা অজৈব ও বিষমুক্ত  ‘ন্যানোপার্টিকেল’ ব্যবহার করে কেমোথেরাপির চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ফলাফল পেয়েছেন। এই ধরনের অতিক্ষুদ্র কণা, যা মানুষের রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ভ্রমণ করে এবং সুস্থ কোষের কোনো ক্ষতি না করে কেবল আক্রান্ত কোষগুলো ধ্বংস করে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানীরা একই ধরনের গবেষণার মাধ্যমে ক্ষুদ্র চুম্বক কণাকে ন্যানোপার্টিকেল হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যা ক্যানসার-আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করবে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, যদি ক্যানসারের অ্যান্টিবডি বা স্টেম কোষের সঙ্গে আয়রন অক্সাইড ন্যানোপার্টিকেল যুক্ত করা যায়, তাহলে ক্যানসার নিরাময়ে সুফল পাওয়া সম্ভব। এখান থেকে আমরা চিন্তার নতুন নতুন ক্ষেত্র নিয়ে ভাবতে পারি। মনে হতে পারে, এই চিন্তাগুলো কাল্পনিক কিংবা অবাস্তব। কিন্তু চিন্তার ইতিহাস বলছে, একসময় যা স্বপ্ন আর কল্পনা বলে মনে করা হতো, সময়ের বিবর্তনে তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এমন একদিন হয়তো আসবে, যখন আমাদের গতানুগতিক এয়ারকন্ডিশনিংয়ের জায়গায় একটা ক্ষুদ্র সেন্সর নিয়ন্ত্রিত ন্যানোপার্টিকেল আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করবে। আবার ন্যানোপার্টিকেল নিজ থেকে এনার্জি উত্পাদন করে আমাদের বিদ্যুত্-চাহিদা পূরণ করবে। এ ধরনের কাল্পনিক চিন্তা এখন বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

চিন্তা একমাত্রিক কিংবা বহুমাত্রিক হতে পারে। একমাত্রিক চিন্তার মধ্যে কোনো একটি বিশেষ জ্ঞানের বহুমাত্রিক ধারার চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারে। অন্যদিকে বহুমাত্রিক চিন্তা কোনো একটি বিশেষ জ্ঞানের ওপর না হয়ে, বিভিন্ন জ্ঞানের ভিন্নমাত্রিকতার সমন্বিত চিন্তা বিকশিত করতে পারে। অনেকেই ভাবতে পারেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি একজন চিত্রশিল্পী। ‘লাস্ট সপার’, ‘ভার্জিন অব দ্য রকস’, আর ‘মোনালিসা’র মতো বিস্ময়কর ছবিগুলো এঁকে তিনি পৃথিবীকে বিমোহিত করেছেন। কিন্তু তিনি তার চিন্তার জগেক একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। চিন্তার বহুমাত্রিক ধারণার প্রতিফলন ঘটিয়ে চিন্তার চর্চার মাধ্যমে চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। উদ্ভাবন, চারুকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্যবিদ্যা, বিজ্ঞান, সংগীত, গণিত, প্রকৌশলবিদ্যা, সাহিত্য, অ্যানাটমি, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ইতিহাসচর্চা ও মানচিত্রাঙ্কন, জ্ঞানবিজ্ঞান ও সৃজনশীলতার ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যে বিচরণ করেছেন। অ্যানিমোমিটার, প্যারাশুট, অর্নিথপটার, এরিয়াল স্ক্রু, ট্রিপল ব্যারেল ক্যানন, বৃহদাকৃতির ধনুক, সাঁজোয়া ট্যাংক, ৩৩ ব্যারেলের অর্গান, ঘূর্ণায়মান ব্রিজ, কলোসাস, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, রবোটিক নাইটের মতো বিস্ময়কর ধারণাগুলো তার চিন্তাশক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। একই বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে মানুষে মানুষে চিন্তার ভিন্নতা থাকতে পারে।

তবে এই ভিন্নতার লক্ষ্য যাতে মানুষের কল্যাণের জন্য হয়, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনীতিতে তিন জন নোবেলজয়ী একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মানুষের মানসিকতার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক উন্নয়ন একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কারণ মানবিক প্রগতি ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে মানবিক প্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ; সেটি হলো— অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চেয়ে মানবিক প্রগতি রাষ্ট্রের সমৃদ্ধিতে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে। এখানে তিনি মানবিক উন্নয়ন বলতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণ এবং সমাজে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্যকে কমিয়ে আনার কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনৈতিক আচরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান ঘোচানোর কৌশল নির্ধারণের কথা বলেছেন। তিনি অর্থনীতিকে অনেক বেশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। অর্থনীতির একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রক উপাদান হিসেবে থ্যালার ‘নাজিং’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘আলতো ছোঁয়া’। এই ‘আলতো ছোঁয়া’ বলতে তিনি সম্ভবত মানুষের মনকে বুঝিয়েছেন। কারণ মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার আচরণকে প্রভাবিত করা সম্ভব। আর এটি যদি ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করা যায়, তাহলে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। অন্যদিকে অভিজিত্ বিনায়ক ব্যানার্জি, এসথার ডুফলো ও মাইকেল ক্রেমারের অর্থনীতির চিন্তায় কাজ করেছে দারিদ্র্য বিমোচনে তাদের পরীক্ষানির্ভর গবেষণা পদ্ধতি। এই তিনজনের পরীক্ষামূলক গবেষণা পদ্ধতি ৫০ লাখের বেশি ভারতীয় শিশুকে উপকৃত করেছে। হার্ড বিহেভিয়ার বা সংঘবদ্ধ আচরণ অর্থনীতির ওপর কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এটি নিয়েও তাদের গবেষণা রয়েছে। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে একজনের চিন্তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে অনেক মানুষের ভিন্নমাত্রিক চিন্তাকে একত্রিত করে সমন্বিত চিন্তায় নতুন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ এভাবে তার নিজের চিন্তাকে অন্যের চিন্তার সঙ্গে আদান-প্রদান করে চিন্তার চর্চা করতে পারে।

তবে সবার আগে মানুষের মধ্যে মানবিক চিন্তার চর্চাকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। একজন মানুষের একটি ভালো মন থাকতে হবে। সেই মনের বিশুদ্ধতা মানুষকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। কেননা, যে মন বিশুদ্ধ ও সংকীর্ণ, তা কখনো ইতিবাচক চিন্তা করতে পারে না। মানুষের চিন্তার পরিধি কোনো একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে না হয়ে যখন বিশ্বজনীন হয়ে উঠবে, তখন মানুষ সর্বজনীন সত্তা লাভ করবে। তখন মানুষ ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো শনাক্ত করার চিন্তাশক্তি অর্জন করতে পারবে। বিবেকতাড়িত চিন্তাশক্তি মানুষকে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেবে। জয় হবে মানুষের, জয় হবে মানবিক সভ্যতার।

n লেখক :অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর