সিলেটের জকিগঞ্জে বিচারের নামে ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম ওরফে ফকির মাস্তান মধ্যযুগীয় কায়দায় গিয়াস উদ্দিনকে (৩৫) বেঁধে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতন করেন। তার এই নির্যাতনের ভিডিও ঘটনার কয়েকমাস পর গত বুধবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়।
অবশেষে সাড়ে ৯ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকা থেকে ফকির মাস্তানসহ তার অপর সহযোগী আরো তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এদিকে কয়েক বছর আগে সিলেটে শিশু রাজনকে হত্যার ঘটনায় দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। আর প্রায় একই কায়দায় যুবক গিয়াস উদ্দিনকে নির্যাতনের ঘটনায় চাঞ্চল্যেও সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় ক্ষোভ। আসামিকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠে। পুলিশ মাঠে নামলে বুধবার রাতেই ফকির মাস্তান গা ঢাকা দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধরা পড়ে।
জকিগঞ্জ থানার ওসি নাসির উদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবাদ মেম্বার, আনোয়ার ও শাহজাহানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, জকিগঞ্জ উপজেলার ৩ নং কাজলশার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম ওরফে ফকির মাস্তান ইউনিয়নের বড়বন্দ গ্রামের মৃত সফর আলীর ছেলে গিয়াস উদ্দিনকে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে হাত-পা বেঁধে পায়ের নিচে বেধড়ক মারপিট করছে। নির্যাতনের শিকার যুবক চিৎকার, চেঁচামেচি ও বাঁচার আকুতি জানালেও রক্ষা হয়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগের এই ঘটনাটি ফকির মাস্তানের ভয়ে চাপা থাকে। গিয়াসের আত্মীয় স্বজনরাও মুখ বুঝে চেপে যায়। ফকির মাস্তান অত্যন্ত প্রভাবশালী ও থানায় নিয়মিত যাতায়াত করতো। তাই সাধারণ মানুষও তাকে ভয় করতো। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় সেই অপকর্মের চিত্রটি প্রকাশ পেয়ে যায়। পুলিশ ভিডিও চিত্র দেখে তাকে আটকের জন্য অভিযানে নামে।
এর আগে গত ১২ নভেম্বর ফকির মস্তানের বিরুদ্ধে সিলেটের পুলিশ সুপারের কাছে আটগ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা শাকিল আহমদ একটি অভিযোগ করেন। সেখানে বলা হয়, ফকির মাস্তানের নির্যাতনে নিহত হয় আবদুল মান্নান। মান্নান তার চাচাতো ভাই।
শাকিল অভিযোগে বলেন, ১০ অক্টোবর দুপুরে ফকির মাস্তান কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আব্দুল মান্নানকে নির্মমভাবে প্রহার করে। প্রহারে ঐ দিন রাতেই মান্নান মারা যায়। পরে তার মুখে বিষ ঢেলে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে ফকির মাস্তান। পরে চুপিসারে ৪-৫ জন লোক নিয়ে ফকির মাস্তান নিহতকে দাফন করে।
অভিযোগে আরো বলা হয়, আশ্রয়ণ প্রকল্পটি কব্জায় রেখে নারী ও মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছে গ্রেফতার। ফকির মাস্তানের বিরুদ্ধে আরো দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা চাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, আব্দুল সালাম বিএনপির কেউ নয়। কোন কমিটিতে তার পদপদবী নেই। সে একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী।
জকিগঞ্জ থানার ওসি মীর মো. আব্দুন নাসের বলেন, তিন মাস আগে আব্দুস সালাম ওরফে ফকির মাস্তান এ কাণ্ড করে। নির্যাতিত ব্যক্তি গিয়াস উদ্দিনকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের আব্দুল মান্নানের ‘হত্যা’ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, আমাদের কাছে খবর ছিলো নিহত মান্নান বিষপান করেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরে সিলেট কোতোয়ালী থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। এ ব্যাপারে জকিগঞ্জ থানায় ঘটনার তিনদিন পর একটি অপমৃত্যু মামলা হয়।
ইত্তেফাক/জেডএইচ