টাকা জালিয়াতচক্রের টার্গেট বেসামাল পেঁয়াজের বাজার

জাল টাকা সহজে চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। জাল টাকা চালানোর মোক্ষম সুযোগ আসে কোরবানির ঈদের পশুর হাট। কিন্তু বিগত পশুর হাটেও তারা সুবিধা করতে পারেনি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা ও পশুর হাটে জাল টাকা শনাক্ত মেশিন ব্যবহারের কারণে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি প্রতারকচক্র ।

 

কিন্তু সম্প্রতি পেঁয়াজের মূল্য অস্বাভাবিক হওয়ায় এ সুযোগটা তারা কাজে লাগানোর টার্গেট করে। কারণ বেশি দামের আশায় যেসব ব্যবসায়ী পেঁয়াজ গুদামজাত করেছে প্রতারকদের ধারণা তাদের কৌশলে অতি সহজে জাল টাকার বান্ডিল ধরিয়ে সম্ভব হবে। এ উদ্দেশে তারা জাল টাকা তৈরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করে আসছিল। প্রথম দিকে তারা সফলও হয়। তবে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পাতানো জালে আটকা পড়ায় ভন্ডুল হয় তাদের সব পরিকল্পনা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানিয়েছে গ্রেফতারকৃত জাল টাকা তৈরি চক্রের ছয় সদস্য। তারা হলেন—দলনেতা সাইফুল ইসলাম ওরফে রনি, গিয়াস উদ্দিন, আজাহার আলী, আসিফ, জীবন বেপারী ও ফোরকান। ডিবি পুলিশের (উত্তর) একটি টিম রবিবার রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকার নির্মাণাধীন অ্যাপার্টমেন্ট আরকে টাওয়ারে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি পুলিশ।

 

অভিযানের সময় ঐ অ্যাপার্টমেন্টের জাল টাকা তৈরির কারখানা থেকে জব্দ করা হয় ৫০ লাখ টাকার জাল নোট। জাল নোট তৈরির কাজে ব্যবহূত ২টি ল্যাপটপ, ৪টি কালার প্রিন্টার ১টি ফয়েল পেপার রোল, ৪টি স্কিন প্রিন্টার ফ্রেম, ১ বান্ডিল কাগজ, ২টি এন্টিকাটার, ২টি স্টিলের স্কেল, ১৫টি অব্যবহূত কালির কৌটা ও ১০টি প্রিন্টারের ব্যবহূত রিফিল। এ ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর থানায় মামলা হয়েছে।

 

এ ব্যাপারে অভিযান পরিচালনাকারী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃত সাইফুলসহ চক্রটির সবাই মিলে দেশের বিভিন্ন স্থানে জাল টাকা বিস্তারের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। তারা প্রথম পাইকারী বিক্রেতার নিকট প্রতি লাখ জাল টাকা বিক্রয় করে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়। এরপর পাইকারী বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রয় করে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রয় করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় এবং দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতা মাঠ পর্যায়ে সেই টাকার মূল্য হয়ে যায় আসল টাকার সমান। মাঠ পর্যায়ে কর্মীরা বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা দ্রব্যাদি ক্রয়ের মাধ্যমে এই জাল নোট বাজারে বিস্তার করে থাকে।

 

মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা সংঘবদ্ধ জালচক্র। এদের সবারই বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। তাদের সবার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। সর্বশেষ গত আড়াই মাস আগে এ চক্রের দলনেতা সাইফুল কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া যায়। তিনি বলেন, জাল টাকা তৈরির মূল কাজটি করে থাকে সাইফুল। আর জাল টাকার বাজারজাত করার কাজটি করে থাকে জীবন বেপারী।

আরো পড়ুন : পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি : ব্যবসা যা করার করে নিয়েছে সিন্ডিকেট

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে, জাল টাকার অভিযোগেই তারা আগেও একাধিকবার গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। দুই মাস আগে তারা কেরানীগঞ্জের একটি বাসায় বসে ক্ষুদ্র পরিসরে জাল টাকা তৈরি করে আসছিল। সম্প্রতি পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের জাল টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। এ কারণে চলতি মাসে তারা কামরাঙ্গীরচর এলাকার ১৬ তলা ভবনের ছয়তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। এখানেই তারা নিয়মিত জাল টাকা তৈরি এবং বাজারজাত করে আসছিল।

 

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, এ চক্রের দলনেতা সাইফুল স্বীকার করছে, জাল টাকা সব সময় বাজারজাত করা যায় না। জাল টাকা বাজারজাত করার মোক্ষম সময় কোরবানির পশুর হাট। এ সময় তারা জাল টাকার পাশাপাশি ভারতীয় রুপীও জাল করে থাকে। আর ভারতীয় রুপী বাজারজাত হয় সীমান্ত এলাকায় গরু চোরাচালানিদের কাছে। কিন্তু কয়েক মাস আগে তারা জাল রুপীসহ ধরা পড়েছিল। তাছাড়া সীমান্তে গরু চোরাচালান কমে যাওয়ায় রুপী জাল করে বাজারজাত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল ইসলাম ও জীবন বেপারী জানিয়েছে, ২০১০ সালে রশিদ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে জাল নোট তৈরির কৌশল শেখে সাইফুল। জাল নোটের ডিলার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে জীবন বেপারী।

 

ইত্তেফাক/ইউবি