হাসান ইমাম
কিছু অসংগতি-অন্যায় আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধরন বদলালেও নারী-পুরুষ বৈষম্য তাই একই সঙ্গে সমাজের সবচেয়ে সাবেকি ও সহনশীল বিষয়ে পরিণত। বলাই বাহুল্য, এতে প্রথম বিশ্ব আর তৃতীয় দুনিয়ায় কিছুমাত্র ফারাক নেই। এই অসাম্য নিয়ে কমবেশি আওয়াজও তোলা হয় বটে, তবে তা অনেকটা নিয়ম রক্ষার ফরম্যাটে। মাঝেমধ্যে দু-একটি বিশেষ ঘটনার জেরে বা উপলক্ষ্যে একটু যা আমলযোগ্য শোরগোল ওঠে; যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের সাম্প্রতিক এক রায়ে যেমন বিষয়টি নতুন করে আলোচনায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নারী ফুটবল দলের অভিযোগ, তারা পুরুষ খেলোয়াড়দের সমান টাকাকড়ি, সুযোগসুবিধা বা প্রচারের আলো—কিছুই পান না। সহজ কথায়, নারী হওয়ার মাশুল গুনছেন তারা; তারা লিঙ্গবৈষম্যের শিকার। অথচ এমন নয় যে নারী খেলোয়াড়রা কম পরিশ্রম করেন, দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনার প্রশ্নে তাদের তাগিদ নেই, দায়বোধ নেই। এর বিপরীতে দেশটির জাতীয় ফুটবল সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের যুক্তি ছিল, বিগত কয়েক বছরে কয়েকজন পুরুষ খেলোয়াড়ের চেয়েও বেশি আয় করেছেন কয়েকজন নারী। তাই এ ধরনের বঞ্চনার অভিযোগের কোনো মানে হয় না, সব ভিত্তিহীন। তবে আদালত এই যুক্তি খারিজ করে বলে, এটা দেশের সার্বিক চিত্র নয়; নারী খেলোয়াড়রা বাস্তবেই সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি।
আদালতের এই কথার প্রমাণ মেলে দেশটির তিন নারী অ্যাথলেটিকের ভাষ্যেও। তারা বলেছেন, মা হওয়ার মূল্য দিতে হচ্ছে তাদের! সন্তান জন্ম দেওয়ার পর স্পনসর সংস্থাগুলো তাদের আয়-রোজগারে কোপ বসিয়েছে। অথচ অ্যাথলেটিকসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে, অর্থের দিক থেকেও ঠিক ততটাই এগিয়ে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের পর্যবেক্ষণ অন্য কোনো দেশের বাস্তবতার নির্যাস নয়? আর এ কথায়ও দ্বিমত করার সম্ভবত কোনো কারণ নেই যে সমাজের সবখানে বিভেদ বজায় থাকলে খেলাধুলায়ও তার আছড় পড়া দস্তুর। সুতরাং এই আলোচনার ফোকাসে খেলাধুলা থাকলেও কাঠগড়ায় কিন্তু গোটা সমাজই। পুরুষ কর্তৃত্ববাদের বিস্তারে সমাজের হেন কোনো জায়গা নেই, যেখানে নারীর অধিকার সংকুচিত নয়। মাস কয়েক আগের কথা, নরওয়ে নারী ফুটবল দলের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা দেন, যতদিন না দেশের জাতীয় ফুটবল সংস্থা নারীদের জন্য আন্তরিকতা দেখাবে, সহায়তার হাত বাড়াবে, তিনি জাতীয় দলের হয়ে বা বিশ্বকাপে খেলবেন না।
টেনিসে ইউএস ওপেনে পুরুষও নারী খেলোয়াড়রা এখন সমান টাকাপয়সা পান ঠিকই, কিন্তু এ-ও এমনি এমনি হয়নি। এটি সম্ভব হয়েছে প্রবাদপ্রতিম এক নারী খেলোয়াড় ১৯৭৩ সালের টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকি দিয়েছিলেন বলে। টেনিসের প্রাচীনতম প্রতিযোগিতা উইম্বলডনেও এই এক যুগ আগেও নারী খেলোয়াড়েরা পুরুষদের সমান টাকাপয়সাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেতেন না। উন্নত বিশ্বের চিত্র দেখে এই উপমহাদেশের দেশগুলোর অবস্থা চোখ বুজে নির্ভুল অনুমান করা যায়। সব খেলাতেই আছেন ভারতীয় নারীরা, কিন্তু তাদের কতজনকে মানুষ চেনে? কালে-ভদ্রে দু-একজনকে নিয়ে মাতামাতি যে হয় না, তা নয়। সিনেমাও হয়েছে দু-একজনের জীবনজয়ের গল্প নিয়ে। কিন্তু বিরাট কোহালিদের ‘বিরাট’ উপস্থিতিতে কজনের মনে থাকে, ভারতের একটি জাতীয় নারী ক্রিকেট দলও আছে! ইতিহাস বলছে, ১৯৮২ সালে ভারেতের জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সদস্যদের বলা হয়েছিল, ১০ হাজার রূপি করে দিলে নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবেন তারা! সেই অবমাননাকর পরিস্থিতি আর নেই সত্যি, কিন্তু সত্যিকার সমাদর যে হচ্ছে, সে কথাই-বা জোর দিয়ে কে বলবে?
সালমা খাতুনদের নাম কজন জানি, এর উত্তর আছে আমাদের নিজেদের কাছেই। সাকিব-তামিমদের নাম-যশের ধারে-কাছে কলসিন্দুরের সানজীদারা নেই; আয়-রোজগারের প্রশ্নে তুলনার প্রশ্নই ওঠে না। পরিসর ছোটো হলেও অর্জনে কিন্তু সালমা-সাবিনারা পিছিয়ে নেই, বরং এগিয়েই বলা যায় (উদাহরণ এশিয়া কাপ)। আশার কথা, অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলে সম্প্রতি যুগান্তকারী ঘোষণাটি এসেছে। দেশটির জাতীয় ফুটবল সংস্থা যত টাকা আয় করবে, পুরুষও নারী খেলোয়াড়রা তাতে সমান হিস্যা পাবেন। সমান এই আয়বণ্টনের অন্য নাম স্বীকৃতি, মর্যাদা। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও শুরু হোক মর্যাদার অধ্যায়।
n লেখক : সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com