এটিএম বুথ জালিয়াতি

চার বছরেও ২০ কোটি টাকা উদ্ধার হয়নি

একের পর এক এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) বুথ থেকে জালিয়াত চক্র কোটি কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এসব লুটের ঘটনায় একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। সর্বশেষ পূবালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার তিনটি বুথ থেকে ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনারও কোনো কূলকিনারা হয়নি। এর আগে চলতি বছরের ৩১ মে রাজধানীতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পাঁচটি এটিএম বুথ থেকে ইউক্রেনের নাগরিকরা ১৬ লাখ টাকা জালিয়াতি করে নিয়ে যায়। ঐ ঘটনায় ছয় ইউক্রেন নাগরিক গ্রেফতার হলেও এখনো টাকা উদ্ধার হয়নি। এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে আলোচিত এটিএম বুথ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। পোলান্ড, রাশিয়া ও জার্মানের একটি প্রতারক চক্র এটিএম বুথ থেকে ছয় মাসের ব্যবধানে প্রায় ১৯ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে লোপাট করে। প্রবাসীদের অ্যাকাউন্ট থেকে এটিএম বুথের মাধ্যমে জালিয়াতি করে তারা। পরবর্তীতে জালিয়াত চক্রের অন্যতম গডফাদার পোলিশ নাগরিক পিউটর গ্রেফতার হলে ডিবি জানতে পারে যে সে দেশের এটিএম বুথ থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা লোপাট করে রাশিয়া হয়ে  জার্মানিতে পাঠায় সেই টাকা।

এসব ব্যাপারে গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পূর্ব বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শহীদুর রহমান বলেন, ‘পূবালী ব্যাংকের এটিএম বুথ জালিয়াতির ঘটনায় অনেকেই ফোন দিয়ে নানা তথ্য দিয়েছেন। সেসব তথ্য যাচাই করে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’ এই চক্রের সদস্যরা বিদেশি কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা বলা খুব কঠিন। তবে আমরা চেষ্টা করছি তাদের শনাক্ত     করা জন্য।’ গত ১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম কলেজ রোড শাখা ও আগ্রাবাদের শেখ মুজিব রোডে দুটি বুথ এবং কুমিল্ল­ার কান্দির পাড় বুথ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তোলা হয়। তবে তা কোনো গ্রাহকের হিসাব থেকে তোলা হয়নি। সাড়ে ছয় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের দুই বুথ থেকে। বাকি আড়াই লাখ টাকা কুমিল্লার বুথ থেকে তোলা হয়েছে। কুমিল্লার কান্দিরপাড় পূবালী বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সময় সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়া একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নিউজ পোর্টালে। সেখানে সময় দেখানো হয়েছে ১০ নভেম্বর রাত পৌনে ৯টা। কোনো একটি চাবি দিয়ে এটিএম মেশিনের একটি অংশ খুলে বিশেষ কোনো যন্ত্রাংশ বসিয়ে পরে দুই জনকে টাকা তুলে নিতে দেখা যায় ঐ ভিডিওতে।

চলতি বছরের ৩১ মে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ছয়টি বুথ থেকে লোপাট হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। এ ঘটনার দুই দিন পর ডিবির একটি টিম পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল থেকে ছয় ইউক্রেন নাগরিককে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা জানায়, মাত্র ১৫ দিনে তাদের চক্র প্রায় অর্ধ কোটি টাকা লোপাট করেছে। এদের মধ্যে তাদের চক্রের দুই সদস্য টাকা নিয়ে বিদেশ পালিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শহীদুর রহমান বলেন, ইউক্রেনের ছয় নাগরিক এখনো কারাবন্দী। তারা কেউই এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে ভারতস্থ ইউক্রেনের দূতাবাসের মাধ্যমে সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। 

যেভাবে বুথ জালিয়াতি হচ্ছে

ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, নতুন পদ্ধতিতে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা এটিএম বুথ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। জালিয়াতির এই আধুনিক কৌশল কোনোভাবেই বাংলাদেশের ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জানা থাকার কথা নয়। কোনোভাবে এটা ধরাও সম্ভব ছিল না। সারা বিশ্বেই এটা একটি নতুন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ব্যাংকের সার্ভারে কোনো রেকর্ড থাকে না। এতদিন এটিএম কার্ড হোল্ডারদের কার্ড নকল বা ক্লোন করে এ ধরনের জালিয়াতি করা হতো। এর পরবর্তীতে বুথের মেশিনে ‘স্কিম ডিভাইস’ এ পাসওয়ার্ড দিয়ে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা লুট করা হতো। সর্বশেষ ইউক্রেন নাগরিকরা সার্ভার হ্যাক করে ভার্জিন কার্ডের মাধ্যমে টাকা জালিয়াতি করেছে। এটিএম বুথে জালিয়াতির জন্য ভার্জিন কার্ড ব্যবহার করে হ্যাকাররা। এটি মূলত এক ধরনের এটিএম কার্ড, যাতে গ্রাহকের কোনো তথ্য-উপাত্ত থাকে না। এসব ভার্জিন কার্ডে গ্রাহকের তথ্য প্রবেশ করানোর পরই তা ব্যাংকের মূল সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উপযোগী হয়। এর আগে টেলার মেশিনে প্রবেশ করানো হলে তা সংশ্লি­ষ্ট ব্যাংকের সার্ভারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে না। জালিয়াতির জন্য ফাস্ট ক্যাশ সিস্টেম নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যাংকের মূল সার্ভারে ম্যালওয়্যারের অনুপ্রবেশ করায় হ্যাকাররা। এটি কাজে লাগিয়ে ব্যাংকের মূল সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও ভার্জিন কার্ডের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলে নিতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা।