হাসান জাবির

বিশ্ব রাজনীতিতে আফ্রিকার গুরুত

ইউরোপ এশিয়াকে ছাপিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমশ নিজেদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলছে আফ্রিকা। পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা আফ্রিকা মহাদেশ আধুনিক মানুষের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত। আয়তন ও জনসংখ্যায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মহাদেশ নিয়ে প্রচলিত আছে অসংখ্য মিথ। আবার বিজ্ঞানীদের মতে প্রায় ৫০ লাখ থেকে ৮০ লাখ বছর আগে এই অঞ্চলেই উত্পত্তি হয়েছিল মানুষের। এরপর বিভিন্ন বিবর্তন শেষে ধীরে ধীরে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে মানুষ। ইতিহাসের বিভিন্ন পরিক্রমায় মানুষের গভীর চিন্তা ও দীর্ঘ পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে আধুনিক বিশ্ব  সভ্যতা। যদিও আফ্রিকা মহাদেশকেই সভ্যতা বিকাশের অন্যতম অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে এ অঞ্চলেই আছে বিশ্বের অনেক বিলুপ্ত সভ্যতার নিদর্শন। বিশেষত প্রায় পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অবস্থান উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশরে। বর্ণবাদের বর্বর ইতিহাস সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও সম্পত্শালী অঞ্চল আফ্রিকা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, এই আফ্রিকাকেই এখনো ক্ষুধা দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। যে কারণে আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার গ্লামারস থেকে অনেকটাই বঞ্চিত আফ্রিকা মহাদেশের জনগণ। সাম্প্রতিককালে প্রাকৃতিক সম্পত্শালী অঞ্চলটিতে কিছুটা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো আশঙ্কাজনক। এতদসত্ত্বেও খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে ভরপুর আফ্রিকা ক্রমেই বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্ব রাজনীতিতে আফ্রিকার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অতি সম্প্রতি রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘প্রথম রাশিয়া আফ্রিকা সম্মেলন।’ আফ্রিকান ইউনিয়নভুক্ত ৫৪টি দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে রাশিয়ার পর্যটন শহর সোচিতে আফ্রিকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে মস্কো। ঔপনিবেশিক জঞ্জাল দূর করতে আফ্রিকার নেতারাও রাশিয়ার সদিচ্ছাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রেক্ষিতে আফ্রিকা মহাদেশের অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে সেখানে বিরাজমান সমস্যা সমাধানে ঐ অঞ্চলের নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবেন।

ইতিহাসের কোনো এক সময় অর্থাত্ উনিশ শতকের শেষ দিকে মহাদেশটির উল্লেখযোগ্য অংশ বৃহত্তর ইউরোপের উপনিবেশে পরিণত হয়। অন্যদিকে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আফ্রিকার মুক্তিকামী মানুষ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। এই ধারাবাহিকতায় আশির দশকের মধ্যেই তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে আফ্রিকার প্রতিটি দেশ ঔপনিবেশিক দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়। ইতিহাসের এই বাস্তবতা সিনাই উপত্যকা দ্বারা এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত আফ্রিকা মহাদেশকে নতুন পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীকালে আফ্রিকার  মুক্তি সংগ্রামের এই ইতিহাস বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে। কিন্তু ঔপনিবেশিক উত্তর যুগে নিজেদের একসময়ের কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্র আফ্রিকার  প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ওপর লোলুপ দৃষ্টি দেয় ইউরোপীয় শিল্প বণিকরা। এখানে উল্লেখ্য, পৃথিবীর মোট ভূ-পৃষ্ঠের ৬ শতাংশ ও মোট স্থলভাগের শতাংশ জায়গা নিয়ে গঠিত আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশেই কিছু না কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—মহাদেশটি ব্যাপকভাবে দারিদ্র্যপীড়িত। ব্যতিক্রম মাত্র গুটিকয়েক দেশ পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। অন্যদিকে ১০০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত আফ্রিকা মহাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যাপক তত্পর বিশ্বশক্তিগুলো। এখানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ক্রিয়াশীল পক্ষগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম কূটনীতিক সামরিক লড়াই অব্যাহত আছে অনেক আগে থেকেই।  স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর যুগে আফ্রিকায় আধিপত্য বিস্তারে আমেরিকা, চীন, ভারত, রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রছন্ন প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা গেছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটিতে অপ্রচলিত সন্ত্রাসবাদের প্রকোপ থাকায় বিশ্বশক্তিগুলোর তত্পরতাও জড়িয়ে আছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। উল্লেখ্য, আফ্রিকার প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষের ধর্ম ইসলাম। অন্যদিকে এখানকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম খ্রিষ্টান। তাদের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ শতাংশ। এছাড়া আফ্রিকা অঞ্চলে অসংখ্য আদি ধর্ম ছাড়াও প্রায় ৩ হাজার ৯০০ প্রাচীন ভাষা প্রচলিত। আফ্রিকা মহাদেশ আবার বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য। এই মহাদেশে অনেক শহর আছে যেগুলোতে গভীর রাতে হায়েনার মতো হিংস্র প্রাণীদের বিচরণ করতে দেখা যায়। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইথিওপিয়ার সারাব শহরের অধিবাসীরা গভীর রাতে পাহাড় থেকে আসা হায়েনার মতো হিংস্র প্রাণীদের খাদ্য সরবরাহ করে নিজেদের ভালোবাসা প্রকাশ করে। এসব বন্যপ্রাণী আফ্রিকার সম্পদ। এদিকে মাত্র কয়েক বছর আগে মহাদেশটির সবচেয়ে অগ্রসর দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্ট বন্য প্রাণী পালন সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে। এই প্রেক্ষিতে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বন্য প্রাণী পালনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক চেহারায় ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। 

আফ্রিকা মহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও কিছুটা সংঘাতপ্রবণ। সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সুশাসনের ঘাটতি সেখানের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ। একই সঙ্গে নির্বাচিত সরকার উত্খাতপূর্বক সামরিক শাসনের উত্থান আফ্রিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হুমকির মুুখে ঠেলে দেয়। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের রেখে যাওয়া ক্ষতের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায়  ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দাবিয়ে রাখতেই ঘন ঘন সেনা অভ্যুথানের ঘটনা ঘটে। আবার ঔপনিবেশিকদের রেখে যাওয়া জঞ্জালের মধ্যে আন্তঃআফ্রিকা সীমান্ত সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ। আর এই কারণে আন্তঃআফ্রিকা সাংস্কৃতিক ঐক্যের বন্ধন বেশ আলগা। একই সঙ্গে সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব দারিদ্র্যপীড়িত মহাদেশটির জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ। যে কারণে সবার জন্য খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো জরুরি পদক্ষেপ খুবই প্রাসঙ্গিক ইস্যু। পাশাপাশি মহাদেশটিতে বিরাজমান উচ্চমাত্রার শিশু মৃত্যুহার হ্রাস করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি জাতিসংঘ। সম্পদ ব্যবস্থাপনার বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট যাবতীয় সমস্যা সমাধানে আফ্রিকান নেতাদের উদাসীনতার কারণেই সব ধরনের মানবাধিকার সূচকে অঞ্চলটি পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে জনগণের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তাসহ দ্রুত শিক্ষার প্রসার ঘটানো সময়ের দাবি। এদিকে নাইজেরিয়ার জ্বালানি সম্পদ আহরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলে তার সুদৃঢ় প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক পরিসরে। এর মধ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে; যা আফ্রিকার ফরেইন ইনভেস্টমেন্টের নতুন চাহিদা পূরণে ফলপ্রসূ হবে। আর এধরনের চাহিদা পূরণে ঔপনিবেশিক প্রভূদের কাছ থেকে দূরে সরে নতুন বন্ধুদের প্রতি হাত বাড়িয়ে  দিতে প্রস্তুত রয়েছেন আফ্রিকান নেতারা। এর প্রতিফলন হচ্ছে শুধু এই বছরই আফ্রিকান দেশগুলোর নেতাদের দুই দফায় চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে দুটি পূর্ণাঙ্গ সম্মেলন আয়োজন। এরমধ্যে চীন-আফ্রিকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনার মধ্যদিয়ে আফ্রিকান নেতারাও নিজেদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশল গ্রহণে প্রয়োজনীয় রসদ পাবেন। অন্যদিকে রাশিয়া, ভারত ও আমেরিকাও সেখানে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। আফ্রিকান বিদ্যুত্ খাতে আমেরিকা বিনিয়োগ করলেও অন্যান্য খাতে চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি। এদিকে রাশিয়ার বিনিয়োগের লক্ষ্য হবে পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। একই সঙ্গে নাইজেরিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা বিধানে এই অঞ্চলটির সঙ্গে রাশিয়া ও চীন একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। গত দুই বছরের মধ্যে আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। এরমধ্যে দুটি দেশে সরকার পতনের কারণ দুর্নীতি। যে কারণে আফ্রিকার সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি রোধে কঠোর আইন দরকার। গত কয়েক দশক থেকেই আফ্রিকা অঞ্চল ঘিরে পরাশক্তিগুলোর সামরিক প্রস্তুতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র দুই বছর আগে আফ্রিকায় প্রথম সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে সেখানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে ভারতও। যদিও পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিবৃত করার লক্ষ্যে আফ্রিকায় সামরিক তত্পরতাকে জায়েজ করছে বিশ্ব শক্তিগুলো। কিন্তু শুধু সোমালিয়ার জলদস্যুতা রোধ করাই তাদের শেষ লক্ষ্য নয়। বিশ্বব্যাপী ক্রমহ্রাসমান ভূ-গর্ভস্থ সম্পদের কথা বিবেচনায় নিলে সমৃদ্ধ আফ্রিকার গুরুত্ব সবার কাছেই আকর্ষণীয় থাকে। এ পর্যায়ে আফ্রিকা ঘিরে নানা কৌশলের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে সামরিক শক্তির প্রদর্শনী লক্ষ্য করা যায়। এমতাবস্থায় আফ্রিকাকে ঘিরে বিশ্বশক্তিগুলোর নানা তত্পরতা অঞ্চলটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেখতে হবে এসব তত্পরতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ উন্নয়ন আফ্রিকায় হচ্ছে কি না?

n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক

সম্পর্ক ও নিরাপত্তা