রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ ভাসানচর প্রকল্প। প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং মানবিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে ভাসানচরে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর পৃথক আনুষ্ঠানিক প্রশংসাপত্র পেয়েছেন অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. মাহফুজার রহমান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দীর্ঘ সময় ভাসানচরের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাঁর দায়িত্বকালে খাদ্য বিতরণ, সাইট ব্যবস্থাপনা, জীবিকায়ন কর্মসূচি, নিরাপত্তা, জরুরি সেবা এবং বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
গত ২০ জুন ডব্লিউএফপির ভাসানচর কার্যালয়ের প্রধান জন মারুটি স্বাক্ষরিত এক প্রশংসাপত্রে তাঁর নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সমন্বয় সক্ষমতার প্রশংসা করা হয়। প্রশংসাপত্রে উল্লেখ করা হয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে খাদ্যসহায়তা ও রেশন পুনর্বিন্যাসের মতো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের ফলে খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম নির্বিঘ্নভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ভাসানচরে মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন ও শান্তিভিত্তিক সমন্বিত কাঠামো (এইচডিপি নেক্সাস) বাস্তবায়নেও তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়।
এর নয় দিন পর, ২৯ জুন ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন স্বাক্ষরিত পৃথক প্রশংসাপত্রেও তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, প্রতিকূল পরিবেশে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাইট ব্যবস্থাপনা, জীবিকায়ন কর্মসূচি, জরুরি সেবা পরিচালনা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় তাঁর সহযোগিতা কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবিক অংশীদারদের মধ্যে গঠনমূলক সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানও প্রশংসিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাসানচরের মতো সংবেদনশীল মানবিক প্রকল্পে প্রশাসনিক দায়িত্ব কেবল সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে আস্থা, সমন্বয় এবং কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয়ের মাধ্যমেই খাদ্য বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকায়ন, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক ফেলো ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মো. মানসুরুল হক বলেন, "ভাসানচরে রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং সমন্বিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। অতিরিক্ত আরআরআরসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. মাহফুজার রহমান সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জাতিসংঘ এবং মানবিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ডব্লিউএফপি ও ইউএনএইচসিআরের পৃথক প্রশংসাপত্র তাঁর ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের সমন্বিত মানবিক ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও প্রতিফলন।"
তিনি আরও বলেন, "রোহিঙ্গা সংকটের মতো জটিল মানবিক পরিস্থিতিতে দক্ষ প্রশাসন, জবাবদিহি এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভবিষ্যতে মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করবে এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করবে।"
বর্তমানে মো. মাহফুজার রহমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ভাসানচরে অর্জিত তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডব্লিউএফপি ও ইউএনএইচসিআরের পৃথক প্রশংসাপত্র কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়; এটি রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

