আপাত শান্তি শ্রীলঙ্কায়

রবিবার প্রধানমন্ত্রী পদে রনিল বিক্রমাসিংহের পুনরাগমনের মধ্য দিয়া শ্রীলঙ্কায় গত দেড় মাসাধিককাল ধরিয়া চলমান রাজনৈতিক অরাজকতার আপাত অবসান ঘটিয়াছে। অবশ্য বিক্রমাসিংহের পদ ফিরিয়া পাইবার মধ্য দিয়া দ্বীপ দেশটিতে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবে বলিয়া কেহই মনে করিতেছেন না। স্মর্তব্য, অক্টোবর মাসের ২৮ তারিখে প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা নিজ-ক্ষমতাবলে রনিল বিক্রমাসিংহকে পদচ্যুত করিয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। বিক্রমাসিংহের সরকারের বিরুদ্ধে তাঁহাকে খুন করিবার পরিকল্পনার অভিযোগ আনয়ন করেন সিরিসেনা। উল্লেখ্য, এই অভিযোগের ব্যাপারে কোনো গ্রেফতার বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না করিয়াই বিক্রমাসিংহকে পদচ্যুত করিয়া ফেলেন সিরিসেনা।

বিক্রমাসিংহে, সিরিসেনা ও রাজাপাকসের সম্পর্কের রসায়ন অতীব বিচিত্র। মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা ও তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেতা বিক্রমাসিংহের উদ্যোগেই ২০১৫ সালে প্রবল প্রতাপ প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন সিরিসেনা। বিস্ময়ের বিষয় এই যে, নির্বাচনে নামিবার আগে রাজাপাকসের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন সিরিসেনা। তাঁহার এই আনুগত্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি সম্পর্কে রাজাপাকসে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অন্ধকারেই ছিলেন। সিরিসেনা প্রেসিডেন্ট হইবার কিছুদিনের মধ্যেই বিক্রমাসিংহ প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হন। প্রথম দুই বত্সর এই দুইজনের মধ্যে সদ্ভাব বিরাজ করিলেও, একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুইজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটিতে থাকে। বিশেষ করিয়া, ভারত ও চীনের সহিত যথাক্রমে বিক্রমাসিংহের ও সিরিসেনার সুসম্পর্ক লইয়া শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক কথাই চালু হইতে থাকে। এমতাবস্থায় চীনপন্থি হিসাবে পরিচিত রাজাপাকসের সহিত সিরিসেনার অতীত বৈরিতার অনেকখানি অবসান ঘটে। তবে সিরিসেনা যে বিক্রমাসিংহকে হটাইবার জন্য এতদূর পর্যন্ত যাইবেন তাহা কেহই সম্ভবত অনুমান করিতে পারেন নাই। এমনকি যাহার জন্য তিনি রাজাপাকসের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করিয়াছিলেন সেই বিক্রমাসিংহ পর্যন্ত এতবড় বিপদ আঁচ করিতে সক্ষম হন নাই।

বিক্রমাসিংহ অবশ্য শুরু হইতে সিরিসেনার সিদ্ধান্তকে অবৈধ হিসাবে আখ্যা দিয়া রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত রাখেন। এইদিকে, সিরিসেনাও বিক্রমাসিংহকে শেষ করিয়া ফেলিবার কোনো চেষ্টা বাকি রাখেন নাই। সিরিসেনা ও রাজাপাকসে মিলিয়া গত ৫০ দিনে অনেক কিছুই করিয়াছেন। সিরিসেনা প্রথমে আইনসভায় ভোটাভুটি করিয়া রাজাপাকসেকে টিকাইয়া রাখিতে চাহিয়াছেন। এই চালে ব্যর্থ হইয়া পার্লামেন্ট বাতিল করিতে চাহিয়াছেন। সর্বশেষে, গত সপ্তাহে নূতন নির্বাচনের ঘোষণা দিয়া বসেন সিরিসেনা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্তে সিরিসেনা এই অবস্থান হইতে সরিতে বাধ্য হন। এই ধারাবাহিকতাতেই রাজাপাকসে সরিয়া যান। তবে সিরিসেনা ও রাজাপাকসে এত সহজে হার মানিবেন বলিয়া মনে হয় না। বেশ কিছুদিন ধরিয়াই তাহারা সংখ্যালঘু তামিলদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের ধুয়া তুলিয়া রাজনৈতিক ফায়দা তুলিতেছেন। এইবার এইগুলি আরো শক্ত হইবে বলিয়াই অনুমান করা হইতেছে। বিক্রমাসিংহের অপসারণের বিরোধিতা করায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধেও প্রচারণা শুরু হইয়াছে। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি যে গোলমেলে থাকিয়া যাইতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই।