স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর পূর্তিতে

স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর পূর্তিতে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমাদের সেই নেতাদের, যাদের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। প্রথমেই আমরা স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি তার সংগ্রামী জীবনের শেষ পর্যায়ে ছয় দফা কর্মসূচি দিয়ে গোটা জনসাধারণকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। সংগ্রামের ধারায় শত নির্যাতনের মধ্যেও তিনি লক্ষ্যবিচ্যুত হননি। সকল সংগ্রামে তার সহকর্মী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসে সরকার গঠন করে, মুজিবনগরকে রাজধানী করে তিনি সাফল্যের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। যুদ্ধ সৈনিকদের ব্যাপার যতটা ছিল, ততটাই ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও ব্যাপার। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার সহযোদ্ধা ছিলেন সেদিনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামারুজ্জামান। আরো অনেক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, যারা যুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করেছিলেন। মওলানা ভাসানীকে করা হয়েছিল তত্কালীন সরকারের উপদেষ্টা। তার সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন কমরেড মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মনোরঞ্জন ধর প্রমুখ। তাদের সবার প্রতি নিবেদন করছি গভীর শ্রদ্ধা।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ৬টা থেকেই আকাশবাণী কলকাতা থেকে কবি নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ পুত্র সব্যসাচীর সুমিষ্ট সুদৃঢ় কণ্ঠে ক্রমাগত প্রচারিত হচ্ছিল ‘আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে/ মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে/ মোর টগবগিয়ে খুন হাসে’ কবিতাটি। আকাশবাণী দিল্লি থেকেও ক্রমাগত প্রচারিত হচ্ছিল আমাদের সম্ভাব্য বিজয়ের আশাপ্রদ নানা বার্তা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও নিরন্তর প্রচারিত হচ্ছিল সম্ভাব্য বিজয়ের নিশ্চিত সব কথা। এর আগে অন্তত তিন দিন ধরে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বন্ধ করার জন্য আকাশবাণী কলকাতা ও দিল্লি থেকে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বারবার প্রচার করা হচ্ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান লে. জে. নিয়াজির প্রতি মুক্তিযুদ্ধের জয়েন্ট কমান্ডের প্রধান লে. জে. অরোরার আত্মসমর্থনের আহ্বান। নিয়াজির আত্মসমর্পণের নিশ্চিত কোনো খবর কোনো প্রচারমাধ্যম থেকে সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রচার করা হয়নি। তবে সারা বাংলাদেশের মানুষ এবং সারা দুনিয়ার মানুষ সেদিন সকাল থেকেই ধরে নিয়েছিল যে দিনের মধ্যেই হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। ঢাকায় বিকাল ৪টার দিকে সবাই জেনে যান যে, রমনা রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিযুদ্ধের জয়েন্ট কম্যান্ডের প্রধান লে. জে. অরোরার নিকট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান লে. জে. নিয়াজির আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ সম্পন্ন হয়েছে।...দিনটা আমাদের জন্য একদিকে ছিল আনন্দের, অপরদিকে বিষাদের। আনন্দের কারণ—আমরা একটি ন্যায়যুদ্ধে জয়ী হয়েছি, আমাদের সংগ্রাম ও যুদ্ধ সাফল্যে পরিণতি পেয়েছে। বিষাদের কারণ—আমরা আমাদের আত্মীয়-বন্ধু অনেককে হারিয়েছি, অগণিত দেশবাসী প্রাণ হারিয়েছেন, সর্বোপরি বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে জীবন উত্সর্গ করেছেন, অনেক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। যারা নানাভাবে সংশ্লিষ্ট তাদের প্রত্যেকের জীবনেই সে এক অন্যন্যসাধারণ উপলব্ধির দিন, যে দিনের অভিজ্ঞার কথা হাজার হাজার বছর ধরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে। আনন্দের কথা, বেদনার কথা কোনোটাই এ দেশের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বিস্মৃত হবে না।

মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যারা সক্রিয় ছিল তাদের সংখ্যা খুব ছোটো ছিল। তারা ছিল প্রধানত মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। ১৯৭১ সালের ১১ই ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকার চারটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। নিষিদ্ধ দলগুলো ছিল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি। ১৬ই ডিসেম্বরের পরে তারা  আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল, অনেকে ভারতে ও পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। ১৯৭২ সালে সরকার হানাদার বাহিনীর সহযোগীদের বিচার আরম্ভ করেছিল। কিন্তু এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯৭৩ সালে সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিচার বন্ধ করেছিল। সাধারণ ক্ষমায় শর্ত ছিল যে, যেসব বিচার আরম্ভ হয়েছিল সেগুলো যথানিয়মে চলবে। যারা  হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস ইত্যাদি করেছে তাদের বিরুদ্ধে বিচারের সুযোগ থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত যে-কেউ বিচার চাইতে পারবেন এবং তাতে যথানিয়মে বিচার হবে। সরকার মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী ও পাকিস্তান কালের বাহিনীর অবশেষকে একত্রিত করে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী গঠন করে।  ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ থেকে একাংশ আলাদা হয়ে গিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করে। জাসদ আত্মপ্রকাশ করে সরকারের এক নম্বর প্রতিদ্বন্ধীরূপে। পলাতক পাকিস্তানিদের সম্পত্তি দখলের হিড়িক পড়ে যায়। আইনের শাসন ভেঙে পড়ে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে  এবং দুর্নীতিতে মত্ত হয়। সরকার সংবিধান প্রণয়নে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণে এবং দুস্থ মানুষদের রক্ষা করার কাজে ব্যস্ত থাকে। বিশৃঙ্খলার মধ্যে কোনোটাই ভালোভাবে সম্পন্ন হচ্ছিল না। অপব্যবস্থার মধ্যে হিংসা-প্রতিহিংসা দেখা দিয়েছিল। সরকারি দল প্রবল ছিল কিন্তু তাতে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অভাব ছিল ক্রমবর্ধমান। সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও ছিল খারাপ। সরকারের চেষ্টা ছিল পুনর্গঠনের। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। একই দিনে বঙ্গবন্ধুর ভাগনে ফজলুল হক মনিকে সপরিবারে এবং বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেননিয়াবাতকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক হিংসা-প্রতিহিংসার ও হত্যাকাণ্ডের ধারা বাংলাদেশে চলছে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দেশের রাজনীতিকে আওয়ামী লীগের বিপরীত ধারায় চালানো হয়। ভারতবিদ্বেষ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি, ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নিয়ে সেই সঙ্গে মুসলিম লীগ ও জামায়াতের অবশেষসমূহকে নিয়ে রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করা হয়। ১৯৭৬ সালের রাজনৈতিক দলবিধি এবং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যেভাবে জাতীয় রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করা হয়, তাতে পাকিস্তানকালের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা স্বাধীতাযুদ্ধের চেতনার ধারা থেকে ক্রমে রাজনীতি দূরে সরে যেতে থাকে। অবশ্য ১৯৭৫ সালের শুরুতে বাকশাল গঠন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ জনগণের বিরূপতার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। জরুরি অবস্থা ঘোষণা, সামরিক আইন জারি, এনজিও ও সিভিল সোসাইটি অরগনাইজেশন প্রবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, পুনরায় জরুরি অবস্থা, জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা বৃদ্ধি, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে অর্থহীন করে ফেলা, নির্বাচনকে সম্পূর্ণ অর্থহীন করে ফেলা, মৌলবাদ-বিরোধী ও নারীবাদী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় সমাজ ও ধর্মীয় শক্তির সক্রিয়তা বৃদ্ধি, রাজনীতিতে ইসলামের অপব্যবহার, জাতীয় সংস্কৃতির অপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া, দুর্নীতি ও অসামাজিক কার্যকলাপের প্রসার  ইত্যাদির মধ্য দিয়ে চলছে বাংলাদেশের রাজনীতি। বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের নানা প্রকল্প নিয়ে। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের কার্যক্রম অনুযায়ী দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন রূপ দেওয়া হয়েছে যে তা জাতিগঠন ও রাষ্ট্রগঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি রূপ নিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে অপসংস্কৃতির ধারায় ঠেলে দিয়েছে। দেশের গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এবং লেখক-শিল্পীদের মধ্যে উন্নত বৌদ্ধিক চরিত্রের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই।

গত আটচল্লিশ বছরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করে অবশ্যই বলতে হবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত করে ফেলা হয়েছে। রাজনীতিকে করে ফেলা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের স্থানীয় দূতাবাসমুখী। শাসকশ্রেণির (আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি-নির্বিশেষে) লোকেরা তাদের ছেলেমেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের নাগরিক করে চলছেন। চলমান রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় অপসংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশবাসীর মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা দরকার। রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন ও উন্নতি দরকার। জাতীয় অপসংস্কৃতির জায়গায় জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা দরকার। দরকার উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সেই সঙ্গে উন্নত চরিত্রের বৌদ্ধিক নেতৃত্ব।

দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে—এ কথা সত্য। এটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদদের সহায়তা দরকার হয় না। চারপাশে তাকালে সহজে বোঝা যায়। পদ্মা সেতু জাতীয় আয়ের দ্বারা নির্মাণ করা হচ্ছে। অবশ্যই এটা প্রশংসনীয়। আর্থিক উন্নতির জন্য সর্বস্তরের মানুষ প্রাণপণে খাটছে। রাজনীতির দুর্গতি ও অপসংস্কৃতির কারণে সামাজিক অন্যায় বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে। ন্যায় কমছে। সামঞ্জস্য কমছে।

আমাদের আটচল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা দরকার জনজীবন, জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য। দলীয় সংকীর্ণতা ক্ষতির কারণ হচ্ছে। দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের চিন্তা ও শৃঙ্খলা দরকার, অপসংস্কৃতির জায়গায় সংস্কৃতি দরকার, জনচরিত্রেরও উন্নতি দরকার। জনগণ চলছে অপসংস্কৃতি অবলম্বন করে; অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতিকে মেনে নিয়ে। এর জন্য বহুলাংশে শাসকশ্রেণি দায়ী—সর্বাংশে নয়।

বাংলাদেশের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ সৃষ্টির বিপুল সম্ভাবনা আছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের জন্য চিন্তাক্ষেত্রে দরকার রেনেসাঁঁস বা বৌদ্ধিক জাগরণ, আজ জনগণের মধ্যে দরকার গণজাগরণ। অবশ্যই বাংলাদেশে তা দেখা দেবে—সময়ের ব্যাপার।

n লেখক : বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, সাবেক অধ্যাপক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়