শফিকুর রহমান রয়েল
এখন পর্যন্ত চলতি বছরের প্রাক্কলিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী বছর তা গিয়ে দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু এ দুটি অঙ্ক গত অক্টোবরে করা প্রাক্কলনের চেয়ে যথাক্রমে ০ দশমিক ২ ও শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কম। সেজন্যই সন্দেহ জন্মেছে অতি সম্প্রতি করা প্রাক্কলনও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় কি না? ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গিয়ে হবে ২ দশমিক ১ শতাংশ; আগের বছরে যা ছিল ৩ শতাংশ। আগামী দুই বছরে যথাক্রমে ২ দশমিক ১ ও ১ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির সভায় আর তার সারমর্ম দাঁড়াচ্ছে খুব সহসাই অর্থনীতির সেই তেজি ভাব ফিরে আসার লক্ষণ নেই। আরো বিস্ময়কর খবর হলো, এক দশক আগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা নেমে আসার পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতির গতি সবচেয়ে দুর্বল থাকার রেকর্ড গড়বে। এর ফলে বিশ্ব জুড়ে সাধারণ প্রভাবগুলোর পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট দেশভিত্তিক ফলাফল বুঝতেও খুব একটা কষ্ট করতে হবে না। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা ঠিকই চিহ্নিত করে ফেলতে পারবেন মন্দাবস্থা চলমান থাকার জন্য দায়ী সব কারণ ও দেশকে।
এ বছর বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তার প্রভাব বেশ ভালোই পড়েছে বৈশ্বিকভাবে ব্যাবসায়িক মনোবৃত্তি ও কার্যক্রমের ওপর। কিছু ক্ষেত্রে (অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলো ও চীন) সামান্য উন্নয়ন প্রতিফলিত হলেও বিবর্ধিত চক্রাকার ও কাঠামোগত ঢিলেমি যে চলমান, তা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে। বৃহত্ উদীয়মান বাজার অর্থনীতিসমূহ যেমন ব্রাজিল, ভারত, মেক্সিকো ও রাশিয়ায় আরো চাপ পড়েছে সুনির্দিষ্ট দেশভিত্তিক দুর্বলতা থেকে। কঠিনতর (আর্জেন্টিনা) আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৃহদাকার অর্থনৈতিক চাপের অধিকতর খারাপ অবস্থা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা (ইরান) এবং সামাজিক ক্ষোভ (ভেনেজুয়েলা, লিবিয়া ও ইয়েমেন) মিলে অর্থনীতির কঠিন চিত্রকে আরো সুগঠিত করেছে।
অর্থনৈতিক আবহ আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পাশাপাশি বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘ-পরিসরের ব্যয়ের অধিকতর সতর্ক হয়ে ওঠা এবং যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর বৈশ্বিক ক্রয়ের হ্রাসগতির ফলেই বস্তুত বিশ্ব অর্থনীতি ঠিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। টেকসই পণ্যের প্রতি খানাচাহিদাও কমে গেছে। যদিও এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কিছুটা বেড়ে গিয়ে যথেষ্ট আশা সঞ্চারিত হয়েছিল। এটা ছিল বিশেষত অটোমোবাইলে। তবে তা সম্ভব হয়েছে মূলত নিয়ন্ত্রণী পরিবর্ত ও নতুন নির্গমন মানের কারণে। কিছু দেশে খুব সম্ভবত রাইড শেয়ারের ব্যবস্থাটিও গাড়ি বিক্রয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
টেকসই পণ্যের ধীরগতির চাহিদা মোকাবিলা করতে গিয়ে বিখ্যাত ও অখ্যাত সব প্রতিষ্ঠানই শিল্প উত্পাদন কমানো ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তাই খুঁজে পায়নি। টেকসই চূড়ান্ত পণ্য এবং সেগুলো উত্পাদনে ব্যবহূত উপাদানগুলোর সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্যের প্রগাঢ় সম্পর্কের ব্যাপারে কাউকে নতুন করে বোঝানো সময়ের অপচয় বৈ কিছুই নয়। অর্থনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা সবাই এটি বোঝে। এগুলো ক্রয়-বিক্রয়ের হার বলতে গেলে স্থবির হয়েই আছে, আর যে কারণেই বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির অবস্থা এক অর্থে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের দুর্বলস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আগ্রাসি প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। চলতি বছরজুড়ে ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকসহ (ইসিবি) বৃহত্তর উদীয়মান বাজারগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়েছে। আবার ইসিবিও ফের সম্পত্তি ক্রয় শুরু করেছে। এসব নীতি গভীরতর ধীর গতিকে প্রতিহত করেছে। নিম্নতর সুদের হার, সহযোগিতামূলক আর্থিক পরিস্থিতি ও চাকরি সৃষ্টি এখন পর্যন্ত অস্থিতিস্থাপক পণ্য ও সেবা ক্রয়কে শক্তি সরবরাহ করে যাচ্ছে। আঁটোসাঁটো শ্রমবাজার ও ক্রমাক্রমে বর্ধিষ্ণু মজুরি পালাক্রমে ভোক্তাদের আস্থা ও খানা ব্যয়ে সহযোগিতা করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালের জন্য অগ্রসর দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২০ সালের জন্যে তা ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে মনে হয়েছিল তাদের প্রবৃদ্ধির হার আরেকটু বেশি হলেও হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাতো হলোই না, বরং উন্নত দেশগুলো প্রাক্কলিত লক্ষ্যই পূরণ করতে পারবে না।
—দ্য গার্ডিয়ান অনুসরণে