আশ্বিনের ক্যানভাসে শুভ্রতার হাতছানি

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭

ভাদ্রের তীব্র, চড়া রোদ মরে এসে আকাশ যখন এক অলৌকিক নীল রং ধারণ করে, তখনই আগমন ঘটে আশ্বিনের। আশ্বিন মানেই এক অদ্ভুত দ্বিমাত্রিকতা—একদিকে উত্সবের ঢাক, অন্যদিকে এক নীরব মন কেমন করা শূন্যতা। এটি কেবল বর্ষা আর শীতের মধ্যখানের একটা সেতু নয়; আশ্বিন আসলে বাঙালির হৃদয়ের এমন এক ঋতু, যা একই সঙ্গে আনন্দ ও এক গভীর উদাসীনতার জন্ম দেয়। প্রকৃতির রূপান্তর আর মানুষের অন্তহীন আবেগের সেই গভীর চাদরে মোড়ানো আশ্বিন।

সাহিত্যে আশ্বিনের বিষাদ
আশ্বিন মাস নিয়ে বাংলা সাহিত্যের কবিদের এক অদ্ভুত মোহ ছিল। এই মাসের রোদ-ছায়ার খেলা, কাশবনের শুভ্রতা আর উত্সবের আমেজ অনেক বিখ্যাত কবির কবিতায় উঠে এসেছে। জীবনানন্দ দাশ আশ্বিনকে দেখেছিলেন এক ভিন্ন গভীরতায়। আশ্বিন মাসের বিষাদ, রূপ ও নস্টালজিয়া সবচেয়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রূপসী বাংলার এই কবি। ‘আশ্বিনের ম্লান চুল’ কবিতায় এক অদ্ভুত শান্ত ও স্নিগ্ধ চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেছেন—‘আশ্বিনের ম্লান চুল দেখা যায় আকাশেতে;—সবুজ পাতাটি ধরে এক ফোঁটা শিশিরের জল যেরকম চুপে চুপে ঝরে যায়,—তেমনি নিশ্চল কুয়াশায় নদীটিরে দেখা যায়;—ম্লান চিল ওড়ে দূর পেতে—খড়ের চালের পরে,— ডুমুরের ডালে বসে আছে; লক্ষ্মীপেঁচা গান গায় একা-একা ধানের ক্ষেতের মৃদু বাতাসে...’।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: শাকিরুল আলম শাকিল

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় আশ্বিন এসেছে উত্সবের আনন্দ, নতুন আলো আর মুক্তির বার্তা নিয়ে। শরত্ ও আশ্বিনের এই রূপান্তরকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন এভাবে—‘আশ্বিনের এই আলোতে কে পাঠাল তোমায় নবীন প্রভাতে। ওগো শিউলি ফুল, ওগো শিউলি ফুল! কী ভুল তুমি করলে, এলে অবেলায়, শরতের এই সোনার আলোয় তোমার পরাণ হারায়...’। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আশ্বিনের হাওয়া ও প্রকৃতির চঞ্চলতাকে তার কবিতায় দারুণ এক ছন্দে বেঁধেছেন। তার কবিতায় আশ্বিন মানেই এক নতুন দোলা :‘আশ্বিনের এই উদাস হাওয়া লাগল আমার গায়,কাশবনের ওই শ্বেত চামরে আকুল করা বায়। নীল আকাশের মেঘের ভেলা, রোদ-ছায়ার এই মধুর খেলা, মন যে আমার কেমন করে, মন যে উড়ে যায়...।’

কাশবনে শুভ্রতার মেলা: আশ্বিন মাসের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো কাশফুল। নদীর পাড়ে, রেললাইনের ধারে কিংবা বিলের ধারে এখন শুধুই শুভ্রতার হাতছানি। মৃদু বাতাসে যখন মাইলের পর মাইল কাশফুল একসঙ্গে দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন মাটির বুকে আকাশ থেকে সাদা মেঘ নেমে এসেছে। এই দৃশ্য দেখার জন্য এবং যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু মুক্তি পেতে মানুষ ছুটে যায় কাশবনের খোঁজে।

নীলিমার বিস্তার ও পেঁজা মেঘ: আশ্বিনের আকাশ যেন কোনো এক দক্ষ চিত্রকরের ক্যানভাস। বর্ষার মেঘলা, ভারী আকাশ ভেঙে চুরমার হয়ে এখানে জেগে ওঠে গাঢ়, অতল নীলিমা। সেই নীলের বুক চিরে ভেসে বেড়ায় হালকা, চঞ্চল পেঁজা তুলোর মতো মেঘের দল। এই মেঘের কোনো দায় নেই, বর্ষণ করার তাগিদ নেই—তারা কেবলই পরিযায়ী পাখির মতো ভেসে চলে এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে। প্রকৃতির এই নির্ভার রূপ মানুষের মনকেও এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতির দিকে ঠেলে দেয়।

কাশবনের হাহাকার ও শুভ্রতা: আশ্বিন মাসের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো কাশফুল। নদীর পাড়ে, রেললাইনের ধারে কিংবা বিলের ধারে এখন শুধুই শুভ্রতার হাতছানি। মৃদু বাতাসে যখন মাইলের পর মাইল কাশফুল একসঙ্গে দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন মাটির বুকে আকাশ থেকে সাদা মেঘ নেমে এসেছে। এই দৃশ্য দেখার জন্য এবং যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু মুক্তি পেতে মানুষ ছুটে যায় কাশবনের খোঁজে।

আশ্বিনে নদীর চরে কিংবা মেঠোপথের ধারে বাতাসের দোলায় যখন মাইলের পর মাইল কাশফুল একসঙ্গে নেচে ওঠে, তখন বুকটা এক অজানা হাহাকারে কেঁপে ওঠে। কাশফুল খুব অল্প সময়ের জন্য ফোটে। এই শুভ্রতা যেমন চোখের শান্তি, তেমনি তা মনে করিয়ে দেয় সুন্দরের নশ্বরতা। বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দে কাশবনের দোল খাওয়া যেন এক নীরব হাহাকার—যা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ভেতরের সব ক্লান্তি ও একাকিত্বকে একনিমেষে ছুঁয়ে যায়।

শিউলি ঝরা ভোর: এক পরম বিচ্ছেদ: আশ্বিনের রাতের শেষ প্রহরে বাতাস কিছুটা শীতল হতে শুরু করে। সেই হিমেল হাওয়ায় গাছের তলায় বিছিয়ে যায় শত শত শিউলি। বোঁটাটি টকটকে কমলে, পাপড়িগুলো ধবধবে সাদা। কিন্তু শিউলির নিয়তি বড় অদ্ভুত—সে রাতে ফোটে আর আলোর মুখ দেখার আগেই ঝরে যায়। ভোরের আলোয় শিউলি কুড়ানোর যে আনন্দ, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক পরম বিচ্ছেদের গল্প। শিউলি ঝরা ভেজা ঘাসের গন্ধ বাঙালির মনে এক ফেলে আসা শৈশবের নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে, যা ফিরে পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।

আগমনি সুরে মিলনের ব্যাকুলতা: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে আশ্বিন হলো প্রতীক্ষার অবসান। মহালয়ার ভোরে রেডিওর সেই চেনা সুর মর্ত্যে দেবীর আগমনি বার্তা ঘোষণা করে। চারদিকে ঢাকের কাঠি, শঙ্খধ্বনি আর ধুনুচির গন্ধ। কিন্তু এই উত্সবের গভীরেও রয়েছে এক চিরন্তন মানবিক আর্তি। দূর-দূরান্তে থাকা সন্তান, পরিজন এই সময়ে ঘরে ফেরে। আশ্বিন তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি মূলত ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগার, চেনা মানুষদের আবার কাছে পাওয়ার এক মহামিলনের মাস।

ইত্তেফাক/এসএএস