বাংলাদেশ এখন অনেক সামনে এগিয়ে

রেজাউল করিম খোকন

স্বা ধীনতার পর বিগত ৪৮ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো পালটেছে। ক্রমশ শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। সময়ের আবর্তনে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক গুণ। স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে এ দেশের অর্থনীতির আকার ছিল অনেক ছোটো। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশর অর্থনীতিতে অনেক পালাবদল ঘটেছে। নানা চড়াইউত্রাই ধাপ অতিক্রম করে বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি একটি ভালো পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এক সময়ে অভাব, দারিদ্র্য ও দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এখন আর সেই দুর্বল অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ আরো আগেই। অনুন্নত দেশ হিসেবে এক সময় পরিচিত ছিল যে বাংলাদেশ, এখন তা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৭০ সালে এ দেশের অর্থনীতিতে মোট জাতীয় উত্পাদনে আকার ছিল মাত্র ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তত্কালীন মুদ্রা বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলারে ৭ টাকা ২৮ পয়সা। সেই হিসাবে, অর্থনীতির আকার দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ফুলে ফেঁপে যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, সেটাও আমাদের বিরাট একটি সাফল্য বলা চলে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের নানা দিক বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয়ই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তাহলো আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে একধরনের শিল্পবিপ্লব ঘটেছে। এখনাকার অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান কয়েক গুণ বেড়েছে। শিল্পবিপ্লবের ৮০ বছরে ইংল্যান্ড জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ২০ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করেছিল। আমাদের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান কমলেও উত্পাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি থেকে ১৬-১৭ কোটিতে পৌঁছালেও খাদ্য ঘাটতি হয়নি। এটিও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড়ো একটি সাফল্য হিসেবে ধরা যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে জিডিপির আকার ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। বর্তমানে মাথাপিছু জাতীয় আয় ১৯০৯ ডলার। ডলারের দিক দিয়ে মাথাপিছু আয় গত বছর সাময়িক যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৯০৯ ডলার, চূড়ান্ত হিসাবে তাই হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিকারক শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে একটি। গার্মেন্টস শিল্প থেকেই আমাদের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মী, বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিত্সক, শিক্ষকরা তাদের পেশায় নিয়োজিত আছেন। দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন তারা। রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ছে দিন দিন। গত নভেম্বর মাসে প্রবাসীরা ১৫৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তার আগের মাসে অক্টোবরে পাঠিয়েছিলেন ১৬৪ কোটি ডলার। গত ২০১৮ সালের নভেম্বরের তুলনায় ২০১৯-এর নভেম্বরে প্রবাসী আয় বেড়েছে। গত বছরের নভেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ১১৮ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশে কৃষি উত্পাদন বেড়েছে অনেক গুণ। উন্নত ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারণে শাকসবজি, ফলমূল উত্পাদন যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে মত্স্য চাষ, হাঁসমুরগি, গবাদি পশুর খামার প্রতিষ্ঠার ফলে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের চাহিদা পূরণ হচ্ছে সহজেই। এক সময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খাদ্যে স্বাবলম্বী হয়েছে—এটা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য একটি সাফল্য।

আর্থিক খাতে নানা পরিবর্তন ও রূপান্তর প্রক্রিয়া এখন সময়ের দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশে। মাইক্রো ফাইন্যান্স থেকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের রূপান্তর আমাদর অর্থনীতিতে একটি আলোচিত বিষয় সন্দেহ নেই। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার বিকাশ এখন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অনেক গতিশীল করেছে। মোবাইল ফোন এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্থাত্ সহস াব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সাফল্যের প্রমাণ দিয়েছে। চলমান এসডিজি (সাসটেইনবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্থাত্ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনেও বাংলাদেশ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

উপনিবেশিক শাসন-শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পর বিজয়ের ৪৮ বছরে আমাদের দীর্ঘ পথচলা শেষে এখন আমরা কোথায় পৌঁছেছি তার হিসাব-নিকাশ, মূল্যায়ন করতে হবে। অমিত সম্ভাবনার একটি দেশ হিসেবে এখন বাংলাদেশকে চেনে সারা বিশ্ব্ব। দেশের অনেক প্রবৃদ্ধি হলেও কিন্তু কিছু মানুষ এখনো পেছনে পড়ে আছে নানা ক্ষেত্রে। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের সবার জন্য উন্নয়নের এবং সমৃদ্ধির সুফল ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন একটি সমাজ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে আমরা সবাইকে নিয়েই এগোতে চাই। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী ট্যানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র, পায়রা বন্দর প্রভৃতি মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শেষে আগামী একদশকে বাংলাদেশ অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির আরো উজ্জ্বল অবস্থানে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

লেখক : ব্যাংকার