ঋণগ্রহীতারা যেভাবে ঋণখেলাপি হন

‘সরল ও এক অঙ্কের সুদের নতুন যুগে ব্যাংকিং খাত, সুবিধা নিয়েও ফাঁকফোকর খুঁজছে ব্যাংক, সার্ভিস চার্জ ও প্রসেসিং ফি বাড়ছে, আমানতে তেরো মাসে বছর’ এই শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে আগামী পহেলা জানুয়ারি থেকে এই এক অঙ্কের সুদের হার চালু হতে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হবে চক্রবৃদ্ধি গণনার পদ্ধতি। খবরটিতে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে কীভাবে ঋণগ্রহীতাদের ঠকায় তার একটা বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কীভাবে নানা প্রকার চার্জ, তস্য চার্জ নিয়ে ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধি করা হয় তার কথাও রিপোর্টটিতে আছে। এর ফলে দেশের শিল্পয়ন বিঘ্নিত হচ্ছে, উত্পাদনমুখী শিল্প গড়ে উঠছে না, ছোটো ও মাঝারি শিল্প মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা পাচ্ছে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা। এসব হচ্ছে বেসরকারি মালিকরা সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায় করে নেওয়ার পরও।

প্রতিবেদনটি পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়, ব্যাংকগুলো কীভাবে একদিকে আমানতকারীদের ঠকাচ্ছে আবার উলটোদিকে ঋণগ্রহীতাদের পকেট কাটছে। ভাবা যায় কোনো কোনো ব্যাংক ১৩ মাসকে বছর হিসাবে ধরে আমানতকারীদের সুদ দেয়। আমরা পরিচিত এক বছরি, ছয়মাসি, তিনমাসি মেয়াদি আমানতে। হঠাত্ করে ১৩ মাস, ৭ মাসের মেয়াদি আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) কোত্থেকে এলো? এটা যে ঠকানোর নতুন একটা ফিকির, তা বুঝতে আমানতকারীদেরও অনেক মেধা খরচ করতে হয়। আমানতকারীদের ঠকানোর আরো অনেক ব্যবস্থা আছে। সেই সবে আজকের আলোচনায় যাব না। আজকে দেখব কীভাবে ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের ঠকায়, কীভাবে তাদেরকে পথে বসায়—সেই দিকটি। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চসুদের কারণে কীভাবে ঋণগ্রহীতারা ঋণখেলাপি হয়। সুদ, তস্য সুদ; চার্জ, তস্য চার্জ ইত্যাদির কারণে অনেক সময় ব্যবসায়ীরা কিস্তির টাকা দিতে পারে না। না দিতে দিতে ঋণখেলাপি হয়। একটা বিষয় তো হরহামেশাই ঘটছে। একটি ব্যাংক প্রকল্প ঋণ দিল। আর প্রকল্প ঋণ দিলেই স্বাভাবিকভাবেই ঐ গ্রাহককে ওয়ার্কিং ‘ক্যাপিটেল’ দিতে হয়। ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল না দিলে ব্যবসায়ী তার কারখানা চালু রাখবে কী করে? প্রথমত, প্রকল্প অনুমোদনের সময়ই অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা কাটছাঁট করা হয়। এতে যন্ত্রপাতি আমদানির সময়ই উদ্যোক্তা নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারপর ওয়ার্কিং ক্যাপিটলের জন্য দৌড়ঝাঁপ। বিদ্যুতের সংযোগ, গ্যাস-সংযোগ সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। মেশিনারি বসেছে। গ্রাহক উত্পাদনে যেতে পারছে না। পারলেও উত্পাদন অব্যাহত রাখতে পারছে না। এভাবে অচিরেই গ্রাহক খেলাপিতে পরিণত হয়। খেলাপিতে পরিণত হয় কারণ এক টাকার ঋণ, সুদ, তস্য সুদ, চার্জ ইত্যাদির ফলে সহসাই দ্বিগুণ হয়ে যায়। চক্রবৃদ্ধি হচ্ছে সুদ গণনার পদ্ধতি। এসব সমস্যা অনুধাবন করে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একবার বলেছিলেন, ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সময়ই ঠিক করে নেয় গ্রাহককে খেলাপি বানাবে তারা। বেশ খাঁটি কথা। ব্যবসা অঙ্ক নয়। সব সময় লাভ হবে, সব সময়ই ক্ষতি হবে—এমন নয়। জিনিসপত্রের দাম কখন কী কারণে বাড়বে-কমবে তা অনেক সময় জানা যায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছে। ‘শিপমেন্ট’-এ বিলম্ব হতে পারে। উত্পাদন বিঘ্নিত হতে পারে। বিপণন সমস্যা হতে পারে। এসব কারণে ব্যবসায়ে ক্ষতি হতে পারে। এগুলো ব্যাংকারদের দেখার কথা। কিন্তু তারা এমন সব ‘ফর্মুলা’ বানিয়ে রেখে দিয়েছে যে ঋণগ্রহীতার যে কোনো সময় খেলাপি হতে হয়। দেখা যায়, যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে তার দ্বিগুণ পরিশোধ করার পরও বাকি থাকে প্রচুর টাকা। এসব নিয়ে কথা হচ্ছে বহুদিন যাবত্। বলা হচ্ছিল, এর প্রতিকার দরকার। এমন সুদ ও তস্য সুদ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ব্যবসায় করা যায় না। অধিকন্তু দুনিয়ার কোনো দেশেই এমন উচ্চ সুদ চালু নেই। বলা হচ্ছিল বারবার এই উচ্চসুদের হারই খেলাপি ঋণের অন্যতম কারণ। এখানে ইচ্ছাকৃত খেলাপির কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে আসল উদ্যোক্তাদের নিয়ে। নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়ে। কথা হচ্ছে ছোটো ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে। তাদের সমস্যা লাঘবের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ উত্পাদনমুখী শিল্প গড়ে তোলার জন্য এক অঙ্কের সুদ চালুর দাবি তাই ছিল ব্যবসায়ীদের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখানে জড়িত নন। সে অনেকদিন আগের কথা। ব্যাংক-মালিকরা কয়েক দফা নিজেরা বসেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বসেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বসেন। সর্বোপরি তারা প্রধানমন্ত্রীকে কথা দেন। কিন্তু নানা ফন্দিফিকির করে মালিকরা ‘নয়ছয়’ সুদ নীতি ২০১৯-এর মধ্যেই কার্যকর করেননি। বিপরীতে তারা এক অঙ্কের সুদের জন্য কথা দিয়ে সরকারের কাছ থেকে কমপক্ষে ৯টি সুবিধা আদায় করে নেন। তারা তাদের করপোরেট কর সাড়ে ৪২ শতাংশ থেকে ৪০ শাতংশ আদায় করে নেন। এতে তারা কম করে হলেও ১২-১৩ হাজার কোটি টাকার সুবিধা পান। তারা ‘সিআরআর’ হ্রাস করিয়ে নেন, যাতে বেশি বেশি ঋণ দিতে পারেন। ‘সিআরআর’ (ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারম্যান্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত একটা নিয়ম। এর হিসাব-পদ্ধতি বদল করে নেওয়া হয়। অনেক ধরনের ক্ষেত্রে ‘প্রভিশনের’ (সংরক্ষণ) হার কমিয়ে নেন। সরকারি আমানতের ক্ষেত্রে যে ‘সিলিং’ ছিল তা শিথিল করা হয়। তারা এখন সরকারি আমানতের ৫০ ভাগের দাবিদার। পরিচালকরা তিন যোগ তিন মোট ছয় বছর বোর্ডে থাকতে পারতেন। তা করা হয় ৯ বছর। এক পরিবারের বোর্ডে থাকতে পারতেন দুই জন। এখন হয়েছে চার জন। এভাবে তালিকা করলে তালিকা আর শেষ করা যাবে না। এক কথায় বলা যায় অর্থমন্ত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের এমন কোনো দাবি নেই, যা মানেননি। দেশের স্বার্থে শিল্পায়নের স্বার্থে বাজার অর্থনীতির নিয়ম ভেঙেই এসব করা হয়। কিন্তু এতত্সত্ত্বেও ২০১৯ সাল পর্যন্ত তারা সুদের ‘নয়ছয়’ নীতি বাস্তবায়ন করেননি। অবশ্য সরকারি ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যেই এই নীতি বাস্তবায়ন করেছে। এখন বাকি বিরাটসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংক। শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী নিজে উদ্যোগ নিয়ে একটা কমিটি করে দিয়েছেন, যারা এই বিষয়টি পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করবে।

দৈনিক ইত্তেফাকের সংশ্লিষ্ট খবর থেকে বোঝা যাচ্ছে, এরই ফল হচ্ছে এক অঙ্কের সুদের হার বাস্তবায়ন। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এই সিদ্ধান্তটি জানার জন্য। এই সিদ্ধান্তটি কার্যকরণের ক্ষেত্রে কিছু বাধার কথা, সমস্যার কথা ব্যাংকাররা বলেন। খেলাপি ঋণ একটি। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে উচ্চতর আদালতে যেসব ‘রিট’ রয়েছে তার বিচার শেষ করা দরকার। ‘অর্থ ঋণ আদালতের’ বড়ো ধরনের সংশোধন পরিমার্জন দরকার। বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনেক অপচয়মূলক খরচপাতি করে, তা বন্ধ হওয়া দরকার। সবচেয়ে বড়ো কথা খেলাপি ঋণ হ্রাসের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে তার প্রতিফলন কেন আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না তা বিচার-বিবেচনা করে দেখা দরকার। এই ক্ষেত্রে একটি বিবেচ্য বিষয় আছে। দৃশ্যত মনে হচ্ছে ব্যাংকাররা ‘আমানত’ (ডিপোজিট) নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। বাজারে ‘আমনতের’ অভাব। তাই তারা উচ্চসুদে আমানত নিচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বাজারে আমানতকারীরাও ৫-৬ শতাংশ সুদে গ্রাহক আমানত রাখতে উত্সাহী নন। এ কারণে অনেক ব্যাংক উচ্চ সুদের কথা প্রচার করে প্রকৃতপক্ষে কমহারে সুদ দিচ্ছে আমানতকারীদেরকে। এমতাবস্থায় সমস্যাটি ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। প্রকৃত উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ীরা যাতে এক অঙ্কের সুদে ঋণ পায় তার ব্যবস্থাও করতে হবে আবার ব্যাংকে যাতে আমানত আসে এবং আমানত যাতে বাড়তে থাকে তার ব্যবস্থাও করা দরকার। শত হোক, আমানত ছাড়া ঋণ দেওয়া যাবে না। সরকার ‘রেমিট্যান্স’ বৃদ্ধির জন্য ডলারপ্রতি দুই টাকা প্রিমিয়ামের ব্যবস্থা করেছে। এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান। এর অনুকরণে আমানতকারীদের কীভাবে মূল্যস্ফীতি পুষিয়ে সুদ দেওয়া যায় তার কথাও ভাবা দরকার। এই জায়াটাতে একটা গোল্ডেন মিন বের করতে হবে। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। এটা খুব কঠিন কাজ নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক ফান্ড আছে। তাদের বার্ষিক মুনাফাও প্রচুর। এসব থেকে আমানতকারীদের কীভাবে পুষিয়ে দেওয়া যায় তার কথা মাথায় রাখা দরকার। শত হোক, সঞ্চয়কে নিরুত্সাহিত করা যাবে না। সঞ্চয়কারীরা ‘সঞ্চয়পত্র’ কিনতে পারবে না, শেয়ারবাজারে যেতে ভয় পায়, ব্যাংকও যদি তাদের স্বার্থ না দেখে, তাহলে তারা যাবে কোথায়? বিষয়টি আলাদাভাবে ভাবা দরকার।

n  লেখক : অর্থনীতিবিদ, সাবেক শিক্ষক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়