জলবায়ু সম্মেলনে অবশেষে সমঝোতা

মহাকবি কালিদাস প্রথম জীবনে এতটাই বোকা ছিলেন যে, কথিত আছে—তিনি গাছের ডালের গোড়াতে বসিয়াই ওই ডালখানি কর্তন করিতেন। কর্তন শেষে কর্তিত ডালখানিসমেত নিজেও ভূপাতিত হইতেন। মানবসভ্যতার শিল্পবিপ্লব এবং শিল্পবিপ্লব হেতু জলবায়ুর পরিবর্তনকে অনেকেই বলিয়া থাকেন কালিদাসের ওই কর্মকাণ্ডের মতো। জলবায়ুর পরিবর্তনকে শিল্পোন্নত ও উন্নয়নের অগ্রগামী কিছু দেশ গালগল্প বলিয়া সম্বোধন করেন। ইহার সত্যতা লইয়া তাহাদের সংশয় থাকিলেও বিশ্বের প্রায় ৯০০ বিজ্ঞানী মিলিয়া ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গত অক্টোবরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছেন। জাতিসংঘের সংস্থা ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা আইপিসিসি প্রকাশ করে ওই প্রতিবেদন। শিল্পবিপ্লব শুরুর আগের চাইতে তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাইলে ক্ষতির পরিমাণ কীরকম হইতে পারে তাহার একটি চিত্র তুলিয়া ধরা হয় প্রতিবেদনটিতে। ইহা ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখিতে হইলে আগামী ১২ বত্সরের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অর্ধেক কমাইতে হইবে বলিয়া মতপ্রকাশ করেন ওই নয় শত বিজ্ঞানী। এখন বলা হইতেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকিলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িতে পারে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সৌদি আরব ও কুয়েতের প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরিয়া রাখিবার বিষয়টি সমর্থন করিতে অস্বীকার করিয়াছে, তবু আশার কথা হইল, সম্প্রতি শেষ হওয়া কপ-২৪ পোল্যান্ড সম্মেলনে ১৯৬টি দেশের প্রতিনিধিরা একটি সমঝোতায় পৌঁছাইয়াছেন। জলবায়ু সংক্রান্ত বৈঠক শেষে ২০১৫-এর প্যারিস জলবায়ু চুক্তি রূপায়ণ করিতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলি বিশ্ব উষ্ণায়ন হ্রাসের ব্যাপারে একটি ‘কমন রুল বুক’ তৈরি করিতে পারিয়াছেন। নূতন এই বিধি অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলিসহ সকল সদস্য দেশকেই নিয়মিতভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসে তাহাদের নেওয়া প্রচেষ্টার বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হইবে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এই ধরনের প্রথম প্রতিবেদনটি দাখিল করিতে হইবে। অন্যদিকে, আরেকটি বিধির আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলিকে ঠিক কী পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দেওয়ার পরিকল্পনা উন্নত দেশগুলি করিতেছে, সেই সম্পর্কিত প্রতিবেদন জাতিসংঘের নিকট জমা দিতে হইবে প্রতি দুই বত্সর অন্তর। ইহা ছাড়াও, উন্নয়নশীল দেশগুলিকে ইতোমধ্যেই প্রদানে সম্মত হওয়া বার্ষিক ১০ হাজার কোটি ডলারের জলবায়ু তহবিলের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা হইবে কিনা, সেই বিষয়টি ২০২০ সালে বিবেচনা করিতে রাজি হইয়াছেন অংশগ্রহণকারীরা।

যদিও ইহা কেবল সমঝোতা মাত্র। এই ‘কমন রুল বুক’ উন্নত দেশসমূহকে মানিতেই হইবে, নচেত্ শাস্তির মুখে পড়িতে হইবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। সম্প্রতি জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডেভেলপমেন্ট হেল্প অ্যালায়েন্স নামে একটি জার্মান বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। সেইখানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা শীর্ষ ১৫টি দেশের তালিকায় রহিয়াছে বাংলাদেশের নামও। বাংলাদেশের বৃহত্তর খুলনা, বরিশাল এবং ভোলার মতো জেলাসমূহে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাইতেছে যাহার মূলে রহিয়াছে জলবায়ু পরিবর্তন। সুতরাং কপ-২৪ সম্মেলনটি ছিল সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।